নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের ভূমি প্রশাসনে অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালচক্র ও জনভোগান্তির অভিযোগ নতুন নয়। একের পর এক আকস্মিক পরিদর্শনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্র সামনে এলেও কেন পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হচ্ছে না—সেই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
সর্বশেষ সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন নারায়ণগঞ্জ সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ও সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে অনুপস্থিতি ও হাজিরা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
একই দিন আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন মাতব্বরও নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি কার্যালয় আকস্মিক পরিদর্শন করেন।
একই দিনে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের দুই দফা আকস্মিক পরিদর্শনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসনের ভূমি ব্যবস্থাপনা।
প্রশ্ন উঠেছে, মাঠপর্যায়ে এত অভিযোগ, এত পরিদর্শন ও ব্যবস্থা গ্রহণের পরও যদি অনিয়মের অভিযোগ থেকে যায়, তাহলে স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি ও জবাবদিহিতার কাঠামো কতটা কার্যকর ?
সকালে খানপুর এলাকায় অবস্থিত কার্যালয় দুটি পরিদর্শনকালে ভূমি প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন কার্যক্রম, সেবার মান, নথিপত্র সংরক্ষণ ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিত না হওয়া এবং উপস্থিত না থেকেও আগে থেকে হাজিরা দেওয়া হয়েছে—এমন ঘটনায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত না থাকলেও অনেকের হাজিরা দেওয়া হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি বলেন, জনগণ দেশের প্রকৃত মালিক এবং তাদের সেবা দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব, কোনো দয়া নয়। তাই সময়মতো অফিসে উপস্থিত থেকে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জনগণকে সেবা দিতে হবে। অনিয়মের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি সেবায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতার পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
পরিদর্শনে কয়েকজন নারী কর্মকর্তা একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও বিচারিক দায়িত্ব পালন করায় তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও উঠে আসে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী।
আগেও ধরা পড়েছিল সিদ্ধিরগঞ্জের চিত্র
নারায়ণগঞ্জের ভূমি অফিসে এটি প্রথম এমন ঘটনা নয়। চলতি বছরের ৪ মার্চ সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনেও চরম দায়িত্বহীনতার চিত্র প্রকাশ্যে আসে। সরকারি সময় শুরু হওয়ার পরও অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং কক্ষ তালাবদ্ধ থাকার ঘটনায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষার পরও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা হয়।
ওই ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একজন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও একজন ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তাকে বদলি করা হয় এবং অন্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমি অফিসে দায়িত্বে অবহেলার ঘটনায় আগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও নারায়ণগঞ্জের ভূমি প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের অসন্তোষ সামনে এসেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—পূর্বের ব্যবস্থা কি শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি অনিয়মের মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করা হয়নি?
দুলাল চন্দ্রকে ঘিরে অভিযোগ, দাবি তদন্তের
সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে ঘিরেও স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, সেবাগ্রহীতা হয়রানি ও অসদাচরণের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও ওঠে।
তবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। জনস্বার্থে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্তের ফল প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্নীতির অভিযোগ পুরোনো, ডিসির নিজস্ব অভিযানও প্রশ্নের জন্ম দেয়
নারায়ণগঞ্জের ভূমি অফিসে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এতটাই দীর্ঘদিনের যে, জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির নিজেও গত ৯ জুলাই আকস্মিকভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা, রাজস্ব শাখা ও রাজস্ব মুন্সিখানা শাখা পরিদর্শন করেন। সে সময় ভূমি সেবাকে ঘুষ, দুর্নীতি, দালাল ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্য এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়।
এরপরে এই অপরাধী দুর্নীতিবাজ চক্র রয়েছে বহাল তবিয়তে বন্ধু ! কি করে ?
দুলাল চন্দ্রের মত চরম অসাধু দুর্নীতিবাজ তুমি কর্মকর্তা মধ্যরাত্রে জেলা প্রশাসকের বাংলোতে কি করেন ?
এমন প্রশ্ন নগরবাসীর মুখে
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি।
জেলা প্রশাসক নিজেই যখন ভূমি সেক্টরে দালালচক্র, হয়রানি ও দুর্নীতির অভিযোগের বাস্তবতা যাচাইয়ে আকস্মিক অভিযানে নামতে বাধ্য হন, তখন তার অধীন প্রশাসনিক কাঠামোয় অভিযোগগুলোর স্থায়ী সমাধানে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ? কার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে? কতজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ? অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে ?
জনপ্রশাসনের একটি অংশের মতে, আকস্মিক পরিদর্শন অনিয়ম শনাক্তের কার্যকর মাধ্যম হলেও শুধু পরিদর্শন দিয়ে দুর্নীতির কাঠামো ভাঙা সম্ভব নয়। অভিযোগ যাচাই, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান, সেবাগ্রহীতার অভিযোগের ডিজিটাল রেকর্ড, দালালচক্র শনাক্ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা এবং শাস্তির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে একই অভিযোগ বারবার ফিরে আসতে পারে।
৪২ লাখ ও ‘৩২ লাখ টাকা দুর্নীতি’সহ অন্যান্য অভিযোগেরও স্বচ্ছ তদন্ত দরকার
নারায়ণগঞ্জের ভূমি প্রশাসন নিয়ে স্থানীয়ভাবে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে।
কার্টুন ভর্তি ৪২ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া এই সেই চক্র এখনো রয়েছে বহাল তবিয়তে। কার আশকারা এরা এখনো চালাচ্ছে দুর্নীতি তার স্বচ্ছ জবাব দিবেন কি? এমন প্রশ্ন নগরবাসীর মুখে।
এর মধ্যে এক নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩২ লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শাখায় আর্থিক অনিয়ম এবং পদায়নকে কেন্দ্র করে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
ডিসির নীরবতা নাকি প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ?
সোমবার সকালে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের আকস্মিক পরিদর্শনের পর জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, জেলার ভূমি প্রশাসনের সামগ্রিক তদারকির দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব অনিয়ম নিয়ে দৃশ্যমান ব্যাখ্যা বা করণীয় কী ?
তবে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় মহলে উত্থাপিত ব্যক্তিগত দুর্নীতি, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় কিংবা পদায়নে অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগের কোনো চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাই এসব অভিযোগও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া প্রতিষ্ঠিত বলে বিবেচিত হতে পারে না।
তবে অভিযোগের মাত্রা যখন এত বেশি এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের একাধিক আকস্মিক পরিদর্শনে দায়িত্বে অবহেলার চিত্র সামনে আসে, তখন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বচ্ছ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক জবাব এবং দৃশ্যমান সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
এখন প্রয়োজন ‘ভিজিট’ নয়, স্থায়ী সংস্কার
ভূমি অফিস সাধারণ মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকেন্দ্রগুলোর একটি। নামজারি, খাজনা, রেকর্ড সংশোধন, ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা কাজে মানুষকে এসব কার্যালয়ে যেতে হয়। ফলে এখানে সামান্য অনিয়মও সরাসরি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ায় এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।
নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাই শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেরিতে অফিসে আসার প্রশ্ন নয়। এটি সেবার মান, প্রশাসনিক তদারকি, হাজিরা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগের তদন্ত এবং সর্বোপরি নেতৃত্বের জবাবদিহিতার প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এখন প্রয়োজন—সব ভূমি অফিসে নিয়মিত অঘোষিত পরিদর্শন, ডিজিটাল হাজিরার কার্যকর ব্যবহার, সেবাগ্রহীতার অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির প্রকাশ্য ব্যবস্থা, অভিযোগভিত্তিক আর্থিক তদন্ত এবং প্রতিটি অভিযানের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ।
একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা প্রয়োজন—অভিযোগ যেই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই উঠুক, পদমর্যাদা বা প্রভাব বিবেচনা না করে তদন্ত হবে।
কারণ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সকালে এসে অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবও আকস্মিক পরিদর্শনে আসবেন, জেলা প্রশাসক নিজেও কয়েক সপ্তাহ আগে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অভিযানে নামবেন—তারপরও যদি একই ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে জনগণের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যায় :
নারায়ণগঞ্জের ভূমি প্রশাসনে অনিয়ম ধরা পড়ছে বারবার—কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা কোথায় ?









Discussion about this post