আমলাপাড়ায় মাদকের ‘সেইফ জোন’
সরদার সোসাইটির ছায়ায় মাদকের কারবার, প্রশ্ন পঞ্চায়েতের ভূমিকা নিয়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ নগরীর প্রাণকেন্দ্রের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা আমলাপাড়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আবাসিক ভবনে ঘেরা এই এলাকাটিই এখন মাদকের বিস্তারের অভিযোগে নগরবাসীর কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে ‘মাদকের সেইফ জোন’ হিসেবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এখানে মাদকের কারবার চলছে। আর এই পুরো ব্যবস্থাপনার নেপথ্যে প্রভাবশালী একটি সামাজিক বলয়ের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আমলাপাড়ার হর্তাকর্তা হিসেবে পরিচিত সরদার পরিবারকে নেতৃত্বে রেখেই গঠিত হয়েছে পঞ্চায়েত কমিটি। কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম সরদার এবং সাধারণ সম্পাদক হানিফ সরদার। দুজনের পরিবারই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে এলাকায় পরিচিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকা পঞ্চায়েত কমিটি যদি মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান না নেয়, তাহলে মাদকবিরোধী লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
অনেকের প্রশ্ন, ‘রক্ষকই কি তাহলে ভক্ষক?’
পঞ্চায়েত আছে, কিন্তু মাদক ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ কোথায় ?
আমলাপাড়া এলাকায় পঞ্চায়েত কমিটির বড় বড় কয়েকটি প্রবেশদ্বার থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গেট পেরিয়েই মাদকের কারবার নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। বিশেষ করে হর্কাস মার্কেট সংলগ্ন কয়েকটি পয়েন্টকে ঘিরে মাদক বেচাকেনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমলাপাড়ার হর্কাস মার্কেটের সামনে ‘দুর্গা মহল’ হিসেবে পরিচিত একটি বাড়ির মাঠকে ঘিরেও মাদকের স্পট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অথচ এর আশপাশেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আমলাপাড়া প্রাইমারি স্কুল, আইন কলেজ, অফিসার্স ক্লাব ও লেডিস ক্লাবসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
একই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ বিচারক এর বাসভবন রয়েছে এই এলাকায়।
প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কয়েক গজের মধ্যে যদি মাদকের আসর বসে, তাহলে স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্ব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে সেটি কীভাবে বছরের পর বছর চলতে পারে ?
‘ইয়ং ভয়েজ’-এর ছায়ায় কারা ?
আমলাপাড়া ইয়ং ভয়েজ নামে একটি সংগঠন নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচিত কয়েকজন তরুণকে এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড ও চলাফেরার সঙ্গে দেখা যায়। সংগঠনটি সরদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন বলেও স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে কোনো মাদকচক্র যদি নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে থাকে, তাহলে তার দায় কার?
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
রাজনৈতিক পরিচয় কি মাদক কারবারিদের ‘ঢাল’?
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের নাম ব্যবহার করে আমলাপাড়ার মাদক কারবারিরা প্রভাব বিস্তার করেছে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ, কোরবানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ ছিল বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর পরও সেই পুরোনো নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভাঙেনি—এমন অভিযোগও রয়েছে। বরং রাজনৈতিক পরিচয় বদলে কেউ কেউ নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এমনকি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় পরিচিত সনি, হর্কাস মার্কেট এলাকার কথিত মাদক ডিলার মানিক এবং শুভ চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত ‘মাইগা সুমন’কে ঘিরেও সরদার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার নানা অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও আইনগতভাবে প্রমাণিত তথ্য পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।
শুভ দাস হত্যা আবারও সামনে আনল আমলাপাড়ার মাদক নেটওয়ার্ক
সম্প্রতি মাদকবিরোধকে কেন্দ্র করে শুভ চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমলাপাড়ার মাদক নেটওয়ার্ককে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া রাহাদ ও বাহারের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল আমলাপাড়ার হাসিয়ারী সমিতির কমিউনিটি সেন্টারের একটি কক্ষ থেকে ডিবি পুলিশ উদ্ধার করেছে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার পর স্থানীয়দের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—যে এলাকায় মাদককে কেন্দ্র করে সংঘাত, হত্যা এবং অস্ত্র-মোটরসাইকেল উদ্ধারের মতো ঘটনা ঘটছে, সেই এলাকার পঞ্চায়েত কমিটি এতদিন কী করেছে ?
সংঘর্ষের পর মানববন্ধন, তারপর নীরবতা ?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমলাপাড়ায় মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে একাধিক পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পঞ্চায়েত কমিটির পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হলেও এরপর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত দুই বছরে মাদককে কেন্দ্র করে এলাকায় নানা বিশৃঙ্খলা দেখা গেলেও পঞ্চায়েত কমিটির পক্ষ থেকে মাদকবিরোধী ধারাবাহিক অভিযান, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ কিংবা প্রকাশ্য সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার তেমন নজির নেই।
ফলে ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত’—এমন মন্তব্যও করছেন কেউ কেউ।
হানিফ সরদারের দাবি
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আমলাপাড়া পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক হানিফ সরদার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তারা এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আমলাপাড়ায় মাদক বিক্রি না করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে মাদকবিরোধী স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে।
হানিফ সরদারের ভাষ্য, “আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কোন মাদক ব্যবসায়ী কখন কোথায় এসে ব্যবসা পরিচালনা করছে, সেটা সবসময় আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। মাদক ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন ।”
তিনি আরও জানান, আগামী সপ্তাহে পঞ্চায়েত কমিটির সভা করে মাদকবিরোধী মানববন্ধনসহ পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
হানিফ সরদারের বক্তব্যের পরও স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি পঞ্চায়েত কমিটি সত্যিই মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্সে’ থাকে, তাহলে আমলাপাড়ায় বারবার মাদকের স্পটের অভিযোগ উঠছে কেন ? কেন মাদকবিরোধী কার্যক্রম কেবল মানববন্ধন ও স্মারকলিপির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে ?
আরও বড় প্রশ্ন—রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক সংগঠন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রভাবশালী বলয়ের মধ্যে মাদক কারবারিদের কারও যদি আশ্রয়-প্রশ্রয় থেকে থাকে, তাহলে সেই বলয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস দেখাবে কে ?
আমলাপাড়ার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মাদকের প্রকৃত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করবে। কার ছত্রছায়ায় মাদক বিক্রি হচ্ছে, কারা অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব জোগাচ্ছে এবং কারা তরুণদের এই ভয়াবহ চক্রে টেনে নিচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা এখন সময়ের দাবি।
কারণ মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ, অস্ত্র, কিশোর অপরাধ এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির ঝুঁকি। শুভ চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড সেই আশঙ্কাকেই আরও প্রকট করে তুলেছে।
এখন দেখার বিষয়, আমলাপাড়ার ‘সেইফ জোন’ হিসেবে পরিচিত এই মাদকবলয় ভাঙতে প্রশাসন ও স্থানীয় পঞ্চায়েত বাস্তবে কতটা কঠোর হয়—নাকি মানববন্ধন, বিবৃতি আর প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে সব উদ্যোগ।









Discussion about this post