শামীম ওসমানের ‘মুরিদ’ এখন বিএনপির সামনের সারিতে
আওয়ামী লীগের নৌকা থেকে বিএনপির মিছিলে সেন্টু, ত্যাগী নেতাকর্মীদের ক্ষোভ
মহানগর প্রতিনিধি :
একসময় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে ‘পীর’ আখ্যা দিয়ে কদমবুচি করে তার পক্ষে ভোট চাওয়া, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এবং দলীয় কার্যালয়ের সভায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা—সবই ছিল প্রকাশ্য। অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই মনিরুল আলম সেন্টুকেই এখন দেখা যাচ্ছে বিএনপির সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সামনের সারিতে।

কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুর এই রাজনৈতিক ‘রূপান্তর’ নিয়েই এখন নারায়ণগঞ্জের বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
তাদের প্রশ্ন—যিনি একসময় বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের নৌকায় উঠেছিলেন, শামীম ওসমানের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়েছিলেন, তিনি কীভাবে আবার বিএনপির সামনের সারিতে জায়গা করে নিলেন?
সর্বশেষ শনিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির র্যালিতে সেন্টুর উপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাকে ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতাদের পাশেই র্যালির অগ্রভাগে দেখা যায়। অথচ দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত বিএনপির অনেক নেতাকর্মী সেখানে সামনের সারিতে ছিলেন না—এমন অভিযোগ করেছেন দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
শামীম ওসমানকে ‘পীর’ বলেছিলেন সেন্টু
রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইতিহাসে সেন্টুর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
২০১৫ সালের ২ জুন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে জনগণের নেতা ও ‘পীর’ আখ্যা দিয়ে তার পক্ষে জনসমর্থন চেয়েছিলেন মনিরুল আলম সেন্টু। সে সময় তিনি শামীম ওসমানের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে তাকে মানুষের কাছে ‘পীর’ হয়ে ওঠার সঙ্গে তুলনা করেন।
এর আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সেন্টু। পরবর্তীতে কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চেয়ারম্যান পদ ধরে রাখার রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালের কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও তার বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থীকে নির্বাচনে সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি।
পরবর্তীতে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হলেও বিএনপির রাজনীতিতে তার সক্রিয়তা দেখা যায়নি। বরং আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে নিয়মিত দেখা যেত। পরে আবারও বহিষ্কারের মুখে পড়েন তিনি।
এরপর ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সেন্টু।
৫ আগস্টের আগে এক সুর, পরে আরেক সুর
সেন্টুর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময়কার তার বক্তব্য ঘিরে।
২০২৪ সালের ৩১ জুলাই কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের জরুরি সভায় সেন্টু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। আন্দোলনকে নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের অভিযোগ তোলেন তিনি।
সেই সভায় আন্দোলনের বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠে নামার আহ্বান জানিয়ে তিনি কঠোর অবস্থানের কথা বলেন। এমনকি ‘ভাই-বাপ’ হলেও ছাড় দেওয়া হবে না—এমন বক্তব্যও দেন বলে ওই সময়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে অভিযোগ করা হয়েছে।
কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মতো সেন্টুর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি দৃশ্যমান হতে থাকে।
বিতর্কিতদের পুনর্বাসন, ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন ?
বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যারা মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে পিছিয়ে পড়ছেন। বিপরীতে অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা ব্যক্তিরা অর্থ ও প্রভাবের মাধ্যমে আবারও দলের সামনের সারিতে জায়গা করে নিচ্ছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের জোট প্রার্থী মুফতী মনির হোসেন কাসেমীর সুপারিশে সেন্টুর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরে তাকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতেও দেখা যায়।
তৃণমূলের একটি অংশের দাবি, বিতর্কিত ব্যক্তিদের এভাবে পুনর্বাসনের নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনের মাঠেও পড়েছে। একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফতুল্লায় জোট মনোনীত প্রার্থী মুফতী মনির হোসেন কাসেমীর পরাজয়ের পেছনে দলের অভ্যন্তরে বিতর্কিতদের পুনর্বাসন ও তৃণমূলের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
সামনের সারিতে সেন্টু, পেছনে আন্দোলনের নেতারা
শনিবারের জেলা প্রশাসনের কর্মসূচিই যেন সেই ক্ষোভকে আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে।
র্যালির সামনের সারিতে সেন্টুর অবস্থান নিয়ে দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এবং মামলার আসামি হওয়া জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনিসহ অনেক নেতার সামনের সারিতে জায়গা না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি বলেন, এটি জেলা প্রশাসনের কর্মসূচি হওয়ায় দলকে বিব্রত করে এমন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর জন্য তাদের নির্দেশনা রয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের লোকজনের সঙ্গে মিলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সুবিধা নেওয়া এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে হয়রানি ও জেলহাজতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িতদের কেউ কেউ এখন অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে সামনের সারিতে অবস্থান করছেন।
তার ভাষায়, এসব বিষয়ে দল কী ব্যবস্থা নেবে, সেটি দলের নীতিনির্ধারকরাই ভালো জানেন।
প্রশ্ন এখন বিএনপির তৃণমূলে
মনিরুল আলম সেন্টুর রাজনৈতিক অবস্থান বদলের ধারাবাহিকতা নিয়ে এখন বিএনপির তৃণমূলের প্রশ্ন একটাই—রাজনীতিতে আদর্শ ও ত্যাগের মূল্য কোথায়?
যে ব্যক্তি একসময় বিএনপির নেতা ছিলেন, পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ হন, শামীম ওসমানকে ‘পীর’ বলে প্রশংসা করেন, আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং সরকার পতনের ঠিক আগে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন—তিনি কীভাবে আবার বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচির অগ্রভাগে চলে আসেন, তার ব্যাখ্যা চান দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা।
তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি শুধু পোশাক ও পরিচয় বদলালেই সামনের সারিতে জায়গা পাওয়া যায়, তাহলে দীর্ঘদিনের মামলা-হামলা, নির্যাতন ও আন্দোলন-সংগ্রামের মূল্য কোথায় ?
এ বিষয়ে জানতে ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম টিটুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের সুস্পষ্ট অবস্থান কী—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। আর সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সেন্টুর সামনের সারিতে অবস্থান বিএনপির তৃণমূলে বিতর্ক ও ক্ষোভ আরও উসকে দেবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








Discussion about this post