নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ট্রাফিক বিভাগের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. আব্দুল করিম শেখের বদলির পরও থামছে না তাঁকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ।
বরং নতুন কর্মস্থল গাজীপুরে যোগ দেওয়ার পর এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তাঁর দীর্ঘ নারায়ণগঞ্জ অধ্যায়ে পরিবহন খাত থেকে অর্থ আদায়, অবৈধ স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি এখন আলোচনায় এসেছে—এই কর্মকর্তার কার্যক্রমের প্রভাব নতুন কর্মস্থলেও পড়বে কি না।
প্রকাশ্য নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন বলছে, আব্দুল করিম নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগের টিআই (প্রশাসন) হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে তাঁর বদলিজনিত বিদায় অনুষ্ঠান হয়। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, তাঁর পরবর্তী কর্মস্থল গাজীপুর জেলা এবং তাঁর স্থলে নারায়ণগঞ্জে নতুন টিআই (প্রশাসন) হিসেবে যোগ দিয়েছেন মো. জিয়াউদ্দীন খান।
তবে বিদায়ী সংবর্ধনার আনুষ্ঠানিক প্রশংসার বিপরীতে মাঠপর্যায়ে তাঁর দায়িত্বকাল নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ধরনের অভিযোগ।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সাইনবোর্ড ও শিমরাইল মোড় এলাকায় বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে।
প্রতিবেদনে অভিযোগকারীরা দাবি করেছিলেন, আব্দুল করিম শেখের নির্দেশে কিছু ট্রাফিক সদস্য ও তাঁদের সহযোগীরা কাকডাকা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহন থেকে টাকা আদায় করতেন এবং টাকা না দিলে ডাম্পিং বা মামলার ভয় দেখানো হতো।
চাঁদাবাজির অভিযোগ, যানজটের বাস্তবতা
আব্দুল করিমের দায়িত্বকাল নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন যানজট ব্যবস্থাপনা।
তাঁর সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে অবৈধ স্ট্যান্ড, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি ও বিভিন্ন গণপরিবহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের আরেক প্রতিবেদনে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে লাইনম্যানের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও প্রকাশিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রুটের বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, বালুবাহী যান, সিএনজি, লেগুনা ও অটোরিকশাকে ঘিরে অর্থ আদায়ের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল আব্দুল করিম । এসব অভিযোগের মধ্যে মাসিক হারে অর্থ আদায়ের কথাও বলা হচ্ছে। তবে এসব দাবির সুনির্দিষ্ট অঙ্ক, অর্থ সংগ্রহের তালিকা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ও লেনদেনের প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘সিন্ডিকেট’ প্রসঙ্গে আরও বড় প্রশ্ন
স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, ট্রাফিক পুলিশের নিচের সারির সদস্যদের একটি অংশ অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহৃত হতো। কেউ নির্ধারিত অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে হয়রানি, মামলা কিংবা গাড়ি ডাম্পিংয়ের ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক কয়েকজন ট্রাফিক সদস্যের কাছ থেকেও এমন অভিযোগ পাওয়ার দাবি করা হচ্ছে যে, অর্থ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ সদস্যরা অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়তেন।
এসব অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি কোনো একক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ তদারকি এবং পুলিশ বিভাগের জবাবদিহির কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
আব্দুল করিম তার উর্ধতন কয়েকজন কর্মকর্তাদের তুষ্ট রাখতেন নানা পন্থায়।
নারায়ণগঞ্জের পর গাজীপুর—নতুন করে নজরদারির দাবি
আব্দুল করিমের নতুন কর্মস্থল গাজীপুর। একই সময়ে সেখানে নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মো. জসিম উদ্দিন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরে দায়িত্ব নেওয়ার পর এসপি জসিম উদ্দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক, কিশোর গ্যাংসহ অপরাধ দমনে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন। তিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জে আব্দুল করিমকে ঘিরে ওঠা পুরোনো অভিযোগগুলো গাজীপুরে নতুন করে খতিয়ে দেখার দাবি উঠতে পারে। বিশেষ করে তাঁর নতুন কর্মস্থলে পরিবহন খাত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে কোনো অভিযোগ এলে তা যেন ব্যক্তিগত প্রভাব বা অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের বাইরে থেকে তদন্ত করা হয়—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আব্দুল করিমের গাজীপুরে যাওয়ার পর এসপি জসিম উদ্দিনকে ‘কলুষিত করার চেষ্টা’ করছেন—বলেও নারায়ণগঞ্জের কয়েকজন ট্রাফিক সদস্য ক্ষোভের সাথে মন্তব্য করেছেন।
‘ক্যাশিয়ার’ তকমা—অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে কে ?
নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আব্দুল করিমকে কথিত একটি সিন্ডিকেটের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করে পরিবহন খাত থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে চাষাড়া এলাকায় একাধিক অবৈধ স্ট্যান্ড এবং বিভিন্ন পরিবহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
সুতরাং এখন মূল প্রশ্ন তিনটি—
নারায়ণগঞ্জে পরিবহন খাত থেকে সত্যিই নিয়মিত অর্থ আদায় হতো কি না ?
হয়ে থাকলে সেই অর্থ কারা সংগ্রহ করত এবং কোথায় যেত ?
এবং এতদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকলে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা কী করেছে ?
ট্রাফিক পুলিশের নির্ভরশীল সূত্রের দাবী, পুলিশ সুপার ও তার সহযোগী কয়েকজন কর্মকর্তাদের আনুপাতিক হারে চাঁদাবাজির অর্থ বন্টন করে সকল অপরাধ ধামাচাপা দিতেন আব্দুল করিম।
জসিম উদ্দিনের জন্যও এটি একটি প্রশাসনিক পরীক্ষা
গাজীপুরের এসপি জসিম উদ্দিন বর্তমানে জেলার অপরাধ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। ফলে নতুন কর্মস্থলে আব্দুল করিমকে ঘিরে কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে সেটিই হবে স্বচ্ছতার বাস্তব পরীক্ষা।
নারায়ণগঞ্জে তাঁর দায়িত্বকালের অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয়, স্বচ্ছ তদন্তেই তা পরিষ্কার হতে পারে। আর যদি অভিযোগের পেছনে সত্যতা থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার পথও খুলবে।
কারণ যানজট নিয়ন্ত্রণের নামে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যদি নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে, সেটি শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়—এটি আইনের প্রয়োগ, সরকারি রাজস্ব, পরিবহন খাত এবং নাগরিক আস্থার প্রশ্ন।
তাই এখন প্রয়োজন অভিযোগ অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে তদন্ত করে পুলিশের সুনাম রক্ষার্থে করতে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী।








Discussion about this post