নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জ শহর যেন এক অদৃশ্য দুষ্টচক্রে আটকে আছে—যেখানে বছর যায়, কর্তা বদলায়, কিন্তু নাগরিক দুর্ভোগের চিত্র একচুলও বদলায় না। এমপি, মন্ত্রী, মেয়র থেকে শুরু করে ডিসি, এসপি, সিভিল সার্জন কিংবা জেলা ও দায়রা জজ—রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদেই একের পর এক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এই পরিবর্তনের সুফল কোথায় ?
অভিযোগ উঠেছে, শত শত কোটি টাকার লেনদেনের এই শিল্পনগরী কার্যত প্রশাসনিক উদাসীনতা ও রাজনৈতিক স্বার্থের বলি হয়ে পড়ে আছে। শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রতিদিন পরিণত হচ্ছে স্থবির যানজটের কারাগারে।
ফুটপাত দখল করে বসেছে হকাররা, ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় হাঁটছেন।
উচ্ছেদ অভিযান যেন শুধুই লোক দেখানো নাটক—কিছুদিন পরই আগের চিত্র ফিরে আসে, যেন কোনোদিন কিছুই হয়নি।
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিক্সার দৌরাত্ম্যে নগরজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। উল্টো পথে চলাচল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা—সব মিলিয়ে সড়ক ব্যবস্থাকে করে তুলেছে সম্পূর্ণ অকার্যকর। প্রশ্ন উঠেছে—এই বিশৃঙ্খলার দায় নেবে কে ?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সন্ধ্যার পর শহরের অলিগলি কার্যত ছিনতাইকারীদের দখলে চলে যায়। দিন-দুপুরেও ঘটছে ছিনতাই, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উঠছে তীব্র প্রশ্ন—তারা কি অক্ষম, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব ?
মাদকও এখন শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ সমাজ ধ্বংসের মুখে, অথচ দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেই।
স্থানীয়দের ভাষায়, “অপরাধীরা এখন আইনের ভয় পায় না, বরং আইনই যেন তাদের নিয়ন্ত্রণে।”
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা দফায় দফায় মাদক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের হামলা শিকার হচ্ছেন। শুধু হামলার শিকার ই নয়, ছিনতাইকারী অপরাধীরা প্রায়ই সরকারি অস্ত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে পরিবেশ দূষণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
শীতলক্ষ্যা নদী আজ বিষাক্ত বর্জ্যের নর্দমায় পরিণত হয়েছে। খাল-নদী দখল, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ যেন ধীরে ধীরে এক অসুস্থ নগরীতে রূপ নিচ্ছে। মশাবাহিত রোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে অতিষ্ঠ মানুষ।
নগরবাসীর ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন উভয়ই।
তাদের দাবি—নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ানো হলেও ক্ষমতায় গিয়ে জনপ্রতিনিধিরা ভুলে যান জনদুর্ভোগের কথা। ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্যক্তিস্বার্থ আর ক্ষমতার রাজনীতিতে।
প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ—দায়িত্বে এসে আশার বাণী শোনানো হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
নগরবাসী স্পষ্ট করে বলছেন—এই সমস্যাগুলোর আর সাময়িক সমাধান নয়, প্রয়োজন স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং কঠোর আইনের প্রয়োগ ছাড়া এই নগরীর মুক্তি অসম্ভব।
শেষ কথা একটাই—নারায়ণগঞ্জের মানুষ আর আশ্বাস চায় না, চায় কার্যকর পরিবর্তন। এখনই সময়, নয়তো এই অবহেলা একদিন ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।









Discussion about this post