এক যুগেও শেষ নয় ‘সাত খুন’ বিচার: প্রশ্নের মুখে বিচারব্যবস্থা, হতাশায় স্বজনরা
নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত ‘সাত খুন’ মামলার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চূড়ান্ত বিচার কার্যকর না হওয়া বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার এক নগ্ন উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রায় হয়েছে, দণ্ডও হয়েছে—কিন্তু বিচার যেন কাগজেই বন্দি।
আর এই বিলম্বের বোঝা বইতে হচ্ছে নিহতদের পরিবারকে, যাদের কাছে প্রতিটি দিন যেন এক একটি যন্ত্রণার পুনরাবৃত্তি।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একটি অপরাধ ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা।
প্রকাশ্য দিবালোকে অপহরণ, পরে নির্মম নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে সাতজন মানুষকে হত্যা—এ যেন আইনের শাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো এক দৃষ্টান্ত।
তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাদের লাশ উদ্ধারের ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
ময়নাতদন্তে উঠে আসে শীতল করা বাস্তবতা—মাথায় আঘাত, গলায় ফাঁস, পরিকল্পিতভাবে লাশ গুমের চেষ্টা। এমন নির্মমতার পরও বিচার কার্যকর না হওয়া নিছক বিলম্ব নয়, এটি বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতার প্রতীক।
মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র, বিচার—সবই সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৭ সালে নিম্ন আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে উচ্চ আদালতও ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। তবুও আজ, এক যুগ পরও, মামলাটি আপিল বিভাগের জটিলতায় ঝুলে আছে। প্রশ্ন উঠছে—এই বিলম্বের দায় কে নেবে ?
বিচারপ্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু আইনি জটিলতার অজুহাতে ঢেকে রাখা যায় না। বরং এটি প্রমাণ করে, বিচার পেতে হলে ভুক্তভোগীদের শুধু আইনের ওপর নয়, সময়ের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়। আর সেই লড়াইয়ে অনেক সময় ন্যায়বিচার নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
নিহতদের পরিবার আজও অপেক্ষায়—কিন্তু সেই অপেক্ষা আর আশার নয়, বরং ক্ষোভ ও হতাশার। তারা প্রশ্ন তুলছেন, “রায় যদি কার্যকরই না হয়, তবে এই বিচার কার জন্য ?”
এই প্রশ্ন এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু রায় দেওয়া নয়, তা বাস্তবায়ন করা। কিন্তু ‘সাত খুন’ মামলার ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই বিচার অস্বীকার—এই বহুল উচ্চারিত সত্য যেন এখানে প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার সময়মতো নিশ্চিত না হলে তা কেবল ভুক্তভোগীদের প্রতি অবিচার নয়, বরং অপরাধীদের জন্য নীরব প্রশ্রয়।
নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনা তাই শুধু একটি মামলার গল্প নয়—এটি বিচারব্যবস্থার জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
১২ বছর পরও যখন বিচার শেষ হয় না, তখন জনগণের আস্থা কোথায় দাঁড়ায়? আর কত বছর অপেক্ষা করলে এই মামলার রায় কার্যকর হবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
নিহতদের স্বজনদের একটাই দাবি—বিচার নয়, ‘বিচারের বাস্তবায়ন’। আর রাষ্ট্রের প্রতি তাদের একটাই প্রত্যাশা—এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটুক, ন্যায়বিচার হোক দৃশ্যমান, দ্রুত এবং চূড়ান্ত।









Discussion about this post