কেপিআই স্থাপনায় দাপট: পদ্মা অয়েল ডিপোতে ঢুকে হুমকি, ‘সন্ত্রাসী মহড়া’—নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে ঘোষিত সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল বার্মাষ্ট্যান্ডস্থ পদ্মা অয়েল কোম্পানির ডিপো যেন এখন অরক্ষিত—এমনই চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার পর।
এমন ঘটনার তিন দিনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় আতংক বিরাজ করছে এলাকাজুড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মহড়ায় নেপথ্য এবং নেতৃত্বদানকারী সহ অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বুক ফুলিয়ে ঘুরছে সন্ত্রাসীরা।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকাশ্যে প্রভাব বিস্তার করে রাজনৈতিক পরিচয়ে একাধিক ব্যক্তি ডিপোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে প্রবেশ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দিয়েছেন, এমনকি সন্ত্রাসী মহড়াও চালিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ডিপো সূত্রে জানা যায়, শনিবার (গতকাল) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে মহানগর কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সাল মোল্লার নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল ডিপোর নিরাপত্তা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করে।
অভিযোগ রয়েছে, তারা নবনিযুক্ত কর্মীদের কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। ঘটনাস্থলেই সীমাবদ্ধ না থেকে পরবর্তীতে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টা না পেরোতেই বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে আরেকটি দল যুবলীগ নেতা আল-আমিন ভুইয়ার নেতৃত্বে ডিপো এলাকায় প্রবেশ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, এ সময় তারা প্রকাশ্যে ‘শক্তি প্রদর্শন’ করে আতঙ্ক ছড়ায়।
স্থানীয়দের দাবি, তাদের সঙ্গে আরিফ, গোলাপ, শ্রমিকলীগ নেতা পলাশের সহযোগী আমিরসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিল।
একই দিনে দুই দফায় এ ধরনের ঘটনা কেপিআইভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে ঘটায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ এই ডিপোর নিরাপত্তা কি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ?
ঘটনার পর বিষয়টি জানানো হলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি টিম বিকেলে ডিপো পরিদর্শনে যায়। তারা ডিপো কর্মকর্তা, পয়েন্টম্যান এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিপোর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি শৃঙ্খলাজনিত কারণে এটিএফ ডেলিভারি পয়েন্টের দুই কর্মী—মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রবি (৫২) ও মনির হোসেন মন্ডল (৫৮)—কে সরিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই একটি চক্র চাপ সৃষ্টি শুরু করে। তাদের ভাষায়, “এটি কেবল কর্মী বদল নয়, ডিপোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।”
তবে অভিযুক্ত ফয়সাল মোল্লা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ডিপোর বিভিন্ন পয়েন্ট এখনো আওয়ামী লীগের দোসরদের নিয়ন্ত্রণে। তারা রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার লিটার তেল পাচার করছে। আমরা বিষয়টি জানতে গিয়েছিলাম, কাউকে হুমকি দেওয়া হয়নি। অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও একাধিক অনলাইন পোর্টালে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু এত বড় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পরও ডিপো ইনচার্জ আমিনুল হক এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি—বারবার যোগাযোগের চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেপিআইভুক্ত স্থাপনায় এ ধরনের অনুপ্রবেশ শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তারা অবিলম্বে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির পাশাপাশি ডিপোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থায়ী নজরদারি, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনায় কারা প্রভাব খাটাচ্ছে, আর কেনই বা তারা বারবার নিরাপত্তা ভেঙে ঢোকার সাহস পাচ্ছে?









Discussion about this post