নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা তেল ডিপোতে ফের একটি সংঘবদ্ধ তেল চোর সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপোর চেকার হিসেবে পরিচিত ফারুক এবং তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত ‘মাইগ্যা রবি’ ওরফে ‘ক্যাশিয়ার রবি’। ডিপোর বিভিন্ন পয়েন্টে তেল উত্তোলন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডিপোতে প্রভাবশালী একটি বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে ফারুক ও তার সহযোগীরা তেল ব্যবসার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর ফারুককে ঢাকায় বদলি করা হলেও সম্প্রতি তিনি আবার গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে ফিরে এসেছেন।
বর্তমানে তাকে ডিপোর পানির পাম্পে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেখান থেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার সহযোগী রবির মাধ্যমে তেল চোর সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযোজন করা হবে।
‘মাইগ্যা রবি’ই নিয়ন্ত্রণ করেন ক্যাশ ?
ডিপো-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, ‘মাইগ্যা রবি’ নামে পরিচিত রবি ফারুকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ডিপোর তেল চোর সিন্ডিকেটের বিভিন্ন সদস্যের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের কারণে তাকে অনেকে ‘ক্যাশিয়ার রবি’ নামে চেনেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তাদের অভিযোগ, ডিপোর বিভিন্ন পয়েন্টে কোন ট্যাংকলরিতে কত পরিমাণ তেল যাবে—এমন বিষয়েও রবির প্রভাব রয়েছে। তার নির্দেশনা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে তেল উত্তোলন ও সরবরাহের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর এলাকার লোক হওয়ার সুবাদে রবি পদ্মা ডিপোতে চাকরি পান। এরপর ধীরে ধীরে ডিপোর বিভিন্ন পর্যায়ে তার প্রভাব বাড়তে থাকে।
যদিও এসব দাবির পক্ষে প্রকাশ্য নথি বা নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল প্রতিবেদকের হাতে নেই।
বেতনের সঙ্গে জীবনযাপনের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন
রবির জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, রবি ক্যাজুয়াল স্টাফ হিসেবে মাসে আনুমানিক সাড়ে আট হাজার টাকা বেতন পেলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মঞ্জিল ভিলায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।
তার আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। কেরানীগঞ্জে তার বিপুল সম্পদ রয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য ও অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড, আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
ফারুকের বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগও সামনে
চেকার ফারুকের বিরুদ্ধে এর আগেও ডিপোতে তেল চুরি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের ভাষ্য, একটি টেলিভিশন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের পর তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ঢাকায় বদলি হওয়ার পরও ডিপোর একটি অংশের কার্যক্রমে তার প্রভাব বজায় ছিল এবং গোদনাইলে তার সহযোগী রবির মাধ্যমে সেই যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও যাত্রাবাড়ী থানায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব মামলার বর্তমান অবস্থা ও ফারুকের সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট থানার নথি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
ফারুকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী। তাদের দাবি, অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে তিনি ডিপোতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছিলেন।
বর্তমানেও একজন স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশে তিনি ঢাকা থেকে গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে ফিরেছেন বলে ফারুক নিজেই বিভিন্নজনের কাছে দাবি করছেন—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে এমন কোনো সুপারিশ করা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, স্থানীয় বিএনপির এক শীর্ষ নেতা ও সাবেক এক ছাত্রনেতাকে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে ফারুক নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে এই অভিযোগেরও কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন—তেল চুরি বন্ধ হবে কবে ?
ডিপো-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম করে আসছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তাদের দাবি, শুধু কর্মস্থল পরিবর্তন বা একজন কর্মকর্তাকে অন্য দায়িত্বে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ডিপোর প্রতিটি পর্যায়ের তেল উত্তোলন, ট্যাংকলরি লোডিং, পরিমাপ, চালান, গেট পাস ও সরবরাহের তথ্য অডিট করতে হবে।
একই সঙ্গে ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ, লোডিং রেকর্ড, ট্যাংকলরির ডিজিটাল ওজন/মিটার তথ্য, চালান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বের নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তদন্তের দাবি
গোদনাইল পদ্মা ডিপো দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্রগুলোর একটি। এখানে তেল চুরি বা সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যবসায়ীদের ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও বড় ধরনের ক্ষতি।
তাই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এড়িয়ে না গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, ডিপোর তেল উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন প্রশাসন ও দায়িত্বশীল তদন্ত সংস্থার নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের সম্পদ, আয়, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং তেল সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা উচিত।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে চেকার ফারুক, ‘মাইগ্যা রবি’ এবং পদ্মা ডিপোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।









Discussion about this post