নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক স্থাপনা ‘বাইতুল আমান’ ভাঙার ঘোষণা দেওয়া বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ অতীতে তার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের উপকার নিয়েছেন—এমন দাবি করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন।
শামীম ওসমানের এই বক্তব্যকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। বিশেষ করে তিনি কারও নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার নাম মিলিয়ে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে শামীম ওসমান দাবি করেন, গত ১৬ বছরে বিএনপির কোনো নেতাকে তিনি ‘বিন্দুমাত্র হার্ম’ করেননি। বরং বিভিন্ন সময়ে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ থেকে মুক্ত করতে তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলেও দাবি করেন। এমনকি একজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে পরবর্তীতে বদলি করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
শামীম ওসমান আরও বলেন, তার রাজনৈতিক দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের পরও প্রতিশোধমূলক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তার নিজের ও পরিবারের বিভিন্ন বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
বাইতুল আমান প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীও যে স্থাপনায় সাহস করেনি, সেখানে ৫ আগস্টের পর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তার দাবি, বাইতুল আমান ভাঙার ঘোষণার আগের দিন যারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাদের কয়েকজন অতীতে তার কাছ থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছেন। এ বিষয়ে তার কাছে প্রমাণ ও রেকর্ড রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সাক্ষাৎকারে তিনি সংশ্লিষ্ট কারও নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করেননি।
তার এই বক্তব্যের পরই নারায়ণগঞ্জের বিএনপির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাইতুল আমান ভাঙার ঘোষণার সঙ্গে মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনায় এসেছিল। তাদের মধ্যে মহানগর বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর নামও আলোচনায় রয়েছে।
বর্তমানে সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, আবু আল ইউসুফ খান টিপু বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও বিতর্কও আলোচনায় এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে শামীম ওসমানের ‘উপকার নেওয়া’ সংক্রান্ত বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তবে শামীম ওসমানের বক্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট বিএনপি নেতার নাম উল্লেখ না থাকায় কার প্রতি তিনি ইঙ্গিত করেছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সাক্ষাৎকারে তিনি একজন সাবেক বিএনপি নেতার গ্রেপ্তার থেকে মুক্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ওই ব্যক্তি বর্তমানে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
তার এই বর্ণনার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের প্রসঙ্গ মিলিয়ে দেখছেন অনেকে। যদিও শামীম ওসমান সরাসরি মান্নানের নাম উল্লেখ করেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শামীম ওসমানের বক্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। ৫ আগস্ট-পরবর্তী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের অতীত সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সময়ে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসছে। ফলে তার বক্তব্য স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব, দলীয় কোন্দল এবং বিভিন্ন নেতার অতীত রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন শামীম ওসমানের এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
তবে শামীম ওসমান যেসব দাবি করেছেন, সেগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ বা কথিত ‘রেকর্ড’ তিনি সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেননি। ফলে তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাদের বক্তব্য এবং তিনি যে প্রমাণের কথা বলেছেন, সেগুলো প্রকাশ্যে আসা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, বাইতুল আমান ভাঙার ঘটনা, ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং অতীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতাদের পারস্পরিক যোগাযোগের প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—শামীম ওসমান আসলে কাদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন ? তার দাবি করা ‘উপকারের’ প্রমাণই বা কী ? আর সেই প্রমাণ সামনে এলে নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে এর প্রভাব কতটা পড়বে—এখন সেটিই হয়ে উঠেছে নতুন আলোচনার বিষয়।









Discussion about this post