জামাল হত্যা: ১৫ বছর পর রায়, রঞ্জুর মৃত্যুদণ্ড—পেছনে সেই ভয়ংকর রাতের গল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
একজন অটোরিকশাচালক। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন অটোরিকশা। কিন্তু সেই অটোরিকশাকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পরিণতিতে ১৫ বছর আগে প্রাণ হারান জামাল।
গলাকেটে হত্যার পর বস্তাবন্দি করে ফেলে রাখা হয়েছিল তার মরদেহ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় এবার একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপরজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক নাজমুন নাহার সুমি এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মনিরুল ইসলাম রঞ্জু ওরফে গালপোড়া রঞ্জুকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আকাশ আহম্মেদকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যে হত্যাকাণ্ডের শুরু ২০১১ সালে
ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালের জুলাইয়ে। তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের পাগলার আমলাপাড়া প্রেসিডেন্ট রোড এলাকায় একটি ময়লার স্তূপ থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় জামাল (৩৫) নামে এক অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করে র্যাব। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় চার দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
জামালের পরিবারের ভাষ্য ছিল, তিনি অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। তার অটোরিকশার মালিক বিষয়টি থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পর ঘটনাটি র্যাবের নজরে আসে। পরে অভিযান চালিয়ে র্যাব জামালের অটোরিকশাটি উদ্ধার করে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
তৎকালীন র্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, জামালের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। মরদেহ থেকে দুর্গন্ধ কমাতে ময়লার স্তূপে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হয়েছিল বলেও র্যাব জানিয়েছিল।
মাদক পরিবহনে অস্বীকৃতিই কি কাল হলো জামালের ?
মামলার অভিযোগ ও তৎকালীন তদন্তসংশ্লিষ্ট বক্তব্যে উঠে আসে, জামালের অটোরিকশা ব্যবহার করে মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করা হতো। জামাল এতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
২০১১ সালে বিডিনিউজ২৪-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে র্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, রঞ্জু বিভিন্ন সময় জামালের অটোরিকশা ব্যবহার করে কুমিল্লা থেকে নারায়ণগঞ্জে মাদক আনতেন এবং ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও অটোরিকশাটি ব্যবহারের অভিযোগ ছিল।
জামাল মাদক পরিবহনে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তখন ধারণা করেছিল র্যাব।
জামালের স্ত্রী সখিনা বেগমও তখন অভিযোগ করেছিলেন, হত্যার আগে রঞ্জু জামালকে তার সঙ্গে যেতে বলেছিলেন। জামাল রাজি না হওয়ায় তাকে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
রঞ্জুকে ঘিরে তখনই উঠেছিল নানা অভিযোগ
জামাল হত্যাকাণ্ডের পর র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন মনিরুজ্জামান রঞ্জু ওরফে গালপোড়া রঞ্জু। তার সঙ্গে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই জামালের মরদেহের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছিল র্যাব।
তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পুলিশের পক্ষ থেকেও রঞ্জুকে একটি অপরাধীচক্রের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ ছিল সে সময়ের তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যের অংশ; পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোন কোন অভিযোগ কীভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তা নির্ধারণ করেছে আদালত।
দীর্ঘ ১৫ বছরের অপেক্ষার পর রায়
হত্যাকাণ্ডের পর মামলা, তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া পেরিয়ে ১৫ বছর পর মামলাটির রায় হলো।
আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আজিজুল হক হান্টুর বক্তব্য অনুযায়ী, জামালকে গলাকেটে হত্যার পর তার মরদেহ বস্তাবন্দি করে পরিত্যক্ত ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পরিবহনে রাজি না হওয়াকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়।
রায়ের মধ্য দিয়ে মামলার দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হলো—মনিরুল ইসলাম রঞ্জু ওরফে গালপোড়া রঞ্জুর মৃত্যুদণ্ড এবং আকাশ আহম্মেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
‘আজমেরী ওসমানের সহযোগী’ পরিচয় কেন আলোচনায় ?
মামলার রায় ঘোষণার পর আবারও আলোচনায় এসেছে রঞ্জুর রাজনৈতিক ও অপরাধজগতের কথিত যোগাযোগের বিষয়টি।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে রঞ্জুকে শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের সহযোগী হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে। আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলিও রঞ্জুর সঙ্গে আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে এই মামলার রায়ে আজমেরী ওসমানের বিরুদ্ধে কোনো সাজা দেওয়া হয়নি। ফলে রঞ্জুর সঙ্গে তার সম্পর্ক বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার যেসব বক্তব্য সংবাদে এসেছে, সেগুলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়েছে, জামিনে মুক্তির পর রঞ্জুর চেহারায় পরিবর্তন আনতে কসমেটিক সার্জারি করানো হয়েছিল এবং তাকে দিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করানো হয়েছে। তবে এই দাবির স্বাধীন সমর্থন বা আদালতের রায়ে এর পৃথক কোনো বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি কৌঁসুলির বক্তব্য/দাবি হিসেবেই বিবেচ্য।
এক দশকের বেশি সময় পর যে প্রশ্নগুলো সামনে
জামাল হত্যার ঘটনা শুধু একটি হত্যামামলার রায়েই শেষ হচ্ছে না; বরং ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের অপরাধজগতের একটি সময়ের চিত্রও সামনে আনে।
একজন সাধারণ অটোরিকশাচালক কীভাবে অপরাধীচক্রের টার্গেটে পরিণত হলেন, তার কর্মজীবনের বাহন কীভাবে কথিত অবৈধ কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল, হত্যার পর কীভাবে মরদেহ গোপনের চেষ্টা হয়েছিল এবং এত বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়া কেন চলল—এসব প্রশ্নও ঘটনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
২০১১ সালের ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আদালতের রায়—এই দীর্ঘ সময়ে নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধের ধরনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু জামালের পরিবারের জন্য মূল প্রশ্নটি ছিল একটাই—প্রাণ হারানো মানুষটির হত্যার বিচার কবে হবে।
১৫ বছর পর সেই প্রশ্নের একটি বিচারিক উত্তর মিলল।
রায়ের সারসংক্ষেপ
- মৃত্যুদণ্ড: মনিরুল ইসলাম রঞ্জু ওরফে গালপোড়া রঞ্জু
- জরিমানা: ২০ হাজার টাকা
- যাবজ্জীবন: আকাশ আহম্মেদ
- জরিমানা: ১০ হাজার টাকা
- রায়: ২৪ আগস্ট ২০২৬
- আদালত: নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত দায়রা জজ প্রথম আদালত
- বিচারক: নাজমুন নাহার সুমি
- ঘটনা: ২০১১ সালে অটোরিকশাচালক জামালকে হত্যা ও মরদেহ গোপন









Discussion about this post