নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ: ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল
দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে জিম্মি সেবাগ্রহীতা, দুদকের অভিযানেও প্রশ্ন কাটেনি
মহানগর প্রতিনিধি
সরকারি সেবার দরজা সবার জন্য খোলা থাকার কথা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয় ঘিরে উঠেছে ভিন্ন চিত্রের অভিযোগ।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ—নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে সরাসরি সেবা নিতে গেলে একের পর এক ভোগান্তি; আর দালালের মাধ্যমে গেলে সেই কাজই নাকি সহজে সম্পন্ন হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সরকারি সেবাকেন্দ্রে দালালনির্ভরতা কীভাবে এতটা শক্তিশালী হলো?
ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা বদলি, ফিটনেসসহ বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, কাগজপত্র জমা দেওয়া থেকে শুরু করে ছবি ও আঙুলের ছাপ দেওয়ার সিরিয়াল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বাড়তি টাকা দাবি করা হয়। নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও দালালকে টাকা না দিলে ফাইল পড়ে থাকে কিংবা নানা অজুহাতে ঘোরানো হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই।
দুদকের অভিযানেই উঠেছিল দালালের প্রসঙ্গ
নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয় নিয়ে অভিযোগ যে একেবারে নতুন নয়, তার একটি প্রামাণ্য নজির রয়েছে ২০২৫ সালের ৭ মে। ওই দিন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে অনিয়ম এবং দালালচক্রের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সারাদেশের ৩৫টি বিআরটিএ কার্যালয়ে একই দিনে পরিচালিত অভিযানের অংশ ছিল এটি।
দুদকের টিম ছদ্মবেশে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলার সময় একজনকে দালাল সন্দেহে আটক করে অফিস প্রধানের কক্ষে নিয়ে যায়। পরে তার কাছে তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহজনক কোনো কাগজপত্র না পাওয়ায় মুচলেকা নিয়ে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধে তদারকি জোরদার এবং সিটিজেন চার্টার যথাযথভাবে অনুসরণের জন্য অফিস কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, দালাল ও সেবাগ্রহীতা হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকেও অন্তত একবার মাঠপর্যায়ে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—অভিযানের পর পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন হয়েছে?
সরকারি ফি এক, বাস্তবে দাবির অভিযোগ আরেক
বিআরটিএর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিভিন্ন ধরনের সেবার জন্য নির্ধারিত ফি রয়েছে এবং অনলাইন পদ্ধতিতেও আবেদন ও ফি পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নির্ধারিত ফি দিয়ে লাইসেন্স নেওয়ার কথা।
কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি ফি দেওয়ার পরও দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা দিতে হয়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বিভিন্ন ধাপে ঘোরানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মুকুল নামে এক সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, “বিআরটিএ অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করা যায় না। দাবি করা টাকা না দিলে মাসের পর মাস লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য ঘুরতে হয়।”
আরিফ হোসেন নামে আরেক ভুক্তভোগী জোর দাবী করে বলেন, “কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে এবং বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। আমি নিজে ২৫ হাজার টাকায় ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে বাধ্য হয়েছি। ঘুষ না দিলে আপনি যতই পরীক্ষায় পাশ করেন সকল কাগজ সঠিক থাকলেও লাইসেন্স হবেন না কোনভাবেই।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
‘মামুন’কে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ
কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারীর বরাত দিয়ে অভিযোগ উঠেছে, ‘মামুন’ নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএকেন্দ্রিক দালালি ও তদবিরের সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি কখনো সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিআরটিএ কার্যালয় যতক্ষণ খোলা থাকেন মামুন ঠিক ততক্ষণ অফিসের সকল কার্যক্রম তদারকি করেন। এই মামুন সেই ঘুম হওয়া শামীম ওসমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ক্যাডার ক্যাঙ্গারু পারভেজের অন্যতম সহযোগী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ শহর দাপড়িয়ে বেড়াতো। ফের যুগের বেশি সময় যাবৎ এই মামুন বিআরটিএর অন্যতম দালাল হিসেবেই পরিচিত। তার ভাই রওশন শামীম ওসমানের পরিবহন সেক্টর এর অন্যতম চাঁদাবাজ হওয়ায় জেলা প্রশাসন পুলিশ প্রশাসনের সকল দপ্তরে দপ্তরে পরিবহনের চাঁদাবাজির বন্টন করে দেওয়ায় তার সাথে সখ্যতা রয়েছে অসাধু কর্মকর্তাদের। আর সেই সুযোগে বিআরটিএ এর সকল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনা করে এ মামুন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএ এক দালাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকল দালালি তো মামুন করে যেখানে অন্য দালালদের কোন খাবার নাই। প্রতিদিন সকাল ৯ টার মধ্যেই এই মামুন সরকারি এই কার্যালয়ে এসে সকল নথি তার নিয়ন্ত্রণে নেয়। বিশ্বাস না হলে দুই চার দিন অত্যন্ত গোপনে সরকারি এই কার্যালয়ে অভিযান চালালেই দেখা যাবে মামুনের দৌড়াত্ম।
‘দালাল ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন’—তাহলে দায় কার ?
বিআরটিএর অনলাইনভিত্তিক সেবা ব্যবস্থা থাকার পরও যদি কোনো সেবাগ্রহীতাকে দালালের দ্বারস্থ হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন শুধু দালালের নয়; প্রশ্ন পুরো সেবা ব্যবস্থাপনার।
বিআরটিএর সরকারি নির্দেশনায় অনলাইনে আবেদন, ফি প্রদান এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
তাহলে অফিসের ভেতরে দালালদের অবাধ বিচরণ নিয়ে অভিযোগ কেন থাকবে?
কেন একজন সাধারণ মানুষ নিজের কাজ নিজে করতে গিয়ে বারবার হয়রানির অভিযোগ করবেন?
কেন সরকারি ফি দেওয়ার পরও অতিরিক্ত অর্থের দাবি উঠবে?
আর কেন ২০২৫ সালের দুদক অভিযানের পরও একই ধরনের অভিযোগ নতুন করে সামনে আসবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ নয়, দুদক ও জেলা প্রশাসনেরও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কর্মকর্তার দাবি—‘নিয়ম মেনেই কাজ হচ্ছে’
অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মাহবুবুর রহমান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, কার্যালয়ে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনলাইনে আবেদন করার পর কাগজপত্র সঠিক থাকলে সেবাগ্রহীতা যথাসময়ে লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারেন।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির জানিয়েছেন, বিআরটিএ কার্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করলে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
তদন্তই পারে ‘ঘুষের সিন্ডিকেট’ আছে কি না স্পষ্ট করতে
অভিযোগের স্তূপ আর পাল্টা অস্বীকার—এই দুইয়ের মধ্যে আটকে থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
বিআরটিএ কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, দালালদের প্রবেশ-বহির্গমন, আবেদন ও ফাইল নিষ্পত্তির সময়, সরকারি ফি জমার রেকর্ড, সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথিত মধ্যস্থতাকারীদের যোগাযোগ এবং ব্যাংক/মোবাইল আর্থিক লেনদেন—সবকিছু যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের ৭ মে দুদক অভিযানের পর কী কী সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল এবং সেগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, সেটিও প্রকাশ্যে আনা দরকার। কারণ অভিযান শুধু একটি দিনের ঘটনা; দুর্নীতি বন্ধের মাপকাঠি হলো তার পরের দিনের পরিবর্তন।
নারায়ণগঞ্জের হাজারো যানবাহন মালিক ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশীর জন্য বিআরটিএ একটি অপরিহার্য সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান। সেখানে যদি সত্যিই ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না—তবে সেটি শুধু সেবাগ্রহীতার হয়রানি নয়, সরকারি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থারও বড় সংকট।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদেরও তা স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
কারণ বিআরটিএতে নাগরিকের অধিকার হওয়া উচিত নির্ধারিত ফি দিয়ে নির্ধারিত সময়ে সেবা পাওয়া—দালালের পকেট ভরানো নয়।









Discussion about this post