সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমি কর্মকর্তা দুলাল দেবনাথকে ঘিরে অভিযোগের পর অভিযোগ
ঘুষ, দালালচক্র, কথিত সম্পদ ও মামলার তথ্য খতিয়ে দেখার দাবি
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। ঘুষ দাবি, সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি, দালালনির্ভর ভূমি সেবা, জমির নামজারির বিনিময়ে জমির অংশ দাবি, কথিত সম্পদের উৎস এবং প্রতারণা-জালিয়াতির মামলাসহ নানা অভিযোগে তিনি আলোচনায় রয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীন ও চূড়ান্ত সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত, আদালতের নথি, আয়কর বিবরণী, সম্পদ বিবরণী ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
চাকরির শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অফিসে
সরকারি নথির একটি প্রকাশিত তালিকায় দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত দেখানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ১২তম গ্রেডের মূল বেতন ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১১তম গ্রেডের মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার ২৩০ টাকা। তবে একজন সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বা সম্পদের পরিমাণ শুধু বেতন দিয়ে বিচার করা যায় না; উত্তরাধিকার, বৈধ ব্যবসা, বিনিয়োগ, পারিবারিক আয়সহ অন্যান্য বৈধ উৎসও থাকতে পারে।
নামজারিতে সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা, জমি দাবির অভিযোগ
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মৌজার ৭৩ শতাংশ ভিটি জমির নামজারি নিয়ে।
প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির কাছে প্রথমে ১০ শতাংশ জমি এবং পরে ৫ কাঠা বা সাড়ে ৭ শতাংশ জমি দেওয়ার শর্তে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে একটি কথোপকথনের অডিও থাকার দাবিও করা হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, নামজারির সরকারি নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা। এর বাইরে অর্থ বা জমির অংশ দাবি করার অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে গুরুতর। তবে কথিত অডিওটির কণ্ঠস্বর, সম্পাদনার বিষয় এবং কথোপকথনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এমন ঘটনার কথা জানেন না বলে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পাঁচ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ
এর আগে গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে কদমতলী এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, চার শতাংশ জমির নামজারি-সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের জন্য তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। টাকা দিতে না পারায় তার নামজারি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নামজারি আবেদন, কেস নম্বর, নথির গতিবিধি, আবেদনকারীর বক্তব্য এবং কোনো লিখিত অভিযোগ থাকলে তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
দালালনির্ভর ভূমি সেবার অভিযোগ
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য এবং তাদের মাধ্যমে নামজারি ও অন্যান্য সেবা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একটি প্রতিবেদনে দুলাল দেবনাথকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, দালাল ছাড়া ভূমি অফিস পরিচালনা সম্ভব নয়। অন্যদিকে সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ ছিল, সরাসরি আবেদন করলে নানা ত্রুটি দেখানো হলেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিলে কাজ দ্রুত হয়।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে সেই অর্থের সঙ্গে কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
‘মুজিবুর রহমান’কে ঘিরে কথিত সিন্ডিকেট
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, মুজিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে দুলাল দেবনাথের কথিত ঘুষের অর্থ লেনদেন করা হয়। তবে এই অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক লেনদেন, অডিও-ভিডিও, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, লিখিত অভিযোগ কিংবা অন্য কোনো স্বাধীন নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ফলে মুজিবুর রহমানকে কথিত দালালচক্রের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করার আগে তদন্তসাপেক্ষ প্রমাণ সংগ্রহ জরুরি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়াও প্রয়োজন।
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
দুলাল দেবনাথের নামে ও তার নিকটাত্মীয়দের নামে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য সম্পদ থাকার দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও বৈধ উৎসের বিষয়ে সরকারি নথি যাচাই না করে কোনো নির্দিষ্ট সম্পদকে তার অবৈধ সম্পদ বলা সমীচীন নয়।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন—তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রি এবং নিকটাত্মীয়দের নামে থাকা সম্পদের উৎস কি যাচাই করা হয়েছে?
পারিবারিক জীবন নিয়ে নানা আলোচনা—তবে তদন্তের বিষয় সম্পদের উৎস
দুলাল দেবনাথের একাধিক বিয়ে, সন্তানদের শিক্ষাজীবন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা পারিবারিক জীবন নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সন্তানদের শিক্ষাজীবন ও বিদেশে অবস্থানের বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে রয়েছে।
এমনকি মেয়ের জন্মদিনে আইফোন উপহার দেওয়ার ভিডিও থাকার দাবিও করা হয়েছে। তবে কোনো পরিবারের সদস্যের শিক্ষার ব্যয়, বিদেশে যাওয়া, বিয়ে বা উপহার পাওয়াকে একা অবৈধ আয়ের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
একইভাবে প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুকে ঘিরে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে প্রশ্ন থাকার দাবি করা হলেও এর পক্ষে কোনো মামলা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, জিডি বা তদন্ত নথি পাওয়া গেলে তবেই বিষয়টি সংবাদে নির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। তাই বিষয়টি আপাতত যাচাইযোগ্য দাবি হিসেবে রাখা প্রয়োজন।
প্রতারণা-জালিয়াতির মামলার তথ্য
দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ আমলী আদালতে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা চলমান এবং সেটি সিআইডিতে তদন্তাধীন—এমন তথ্য সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। তবে মামলা নম্বর, ধারাসমূহ, সর্বশেষ তদন্ত অগ্রগতি এবং আদালতের আদেশের সত্যতা মূল নথি থেকে যাচাই করা জরুরি।
মামলা চলমান থাকা কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে না; আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করতে হবে।
রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ
আপনার দেওয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুলাল দেবনাথ মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলালের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
বর্তমানে ক্রসফারে নিহত টাওয়ার সেলিমের ভাগিনা সুজন সকল ভূমির অপকর্ম নিয়ে আর্থিক লেনদেন বিশ্বস্ততার সাথে দুলাল দেবনাথ এর হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনের অবস্থান
দুলাল দেবনাথকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পদায়নের পর স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জানান, দুলাল দেবনাথকে অস্থায়ীভাবে সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ঘুষ ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখে, আগের লিখিত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ভূমি কর্মকর্তা অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে নতুন সিদ্ধিরগঞ্জ সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারেক আজিজ জানান, দায়িত্ব নেওয়ার দিনই তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
তদন্তের মুখে যে প্রশ্নগুলো
দুলাল দেবনাথকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে সরকারি তদন্ত প্রয়োজন:
১. তার বিরুদ্ধে পূর্বে কতটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে এবং সেগুলোর তদন্ত হয়েছে কি না।
২. তার দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন ভূমি অফিসে নামজারি ও খতিয়ান সংশোধনের নথিতে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না।
৩. কথিত দালালচক্রের সদস্যদের সঙ্গে তার আর্থিক বা যোগাযোগের সম্পর্ক কী।
৪. তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বৈধ উৎস কী।
৫. আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের মিল আছে কি না।
৬. চলমান মামলার প্রকৃত ধারা, তদন্তের অবস্থা ও আদালতের আদেশ কী।
৭. নামজারির বিনিময়ে জমির অংশ দাবির অভিযোগের অডিওটি আসল কি না এবং সেখানে কারা জড়িত।
৮. ‘উপর মহলে’ অর্থ দেওয়ার যে দাবি কথিত অডিওতে রয়েছে, সেটির বাস্তব ভিত্তি আছে কি না।
শেষ কথা
একজন সরকারি ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশিত হলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো সত্য হলে দায় নির্ধারণ এবং মিথ্যা হলে অভিযোগ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অব্যাহতি—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।
সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমি অফিসের সেবাপ্রত্যাশীদের মূল প্রশ্ন তাই একটাই—নামজারি ও ভূমি সেবার নির্ধারিত সরকারি ফি-এর বাইরে কোনো অর্থ বা জমির অংশ দাবি করা হচ্ছে কি না, এবং হলে সেই অর্থ বা সুবিধা কোথায় যাচ্ছে ?








Discussion about this post