মুন্সীগঞ্জ কারাগারে তারেক সাঈদকে নির্যাতনের অভিযোগ
বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে লাঠিপেটার দাবি, পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার আবেদন
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক র্যাব-১১ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে কারা হেফাজতে থাকাকালে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
তাঁর পরিবারের দাবি, গত ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে কারাগারের ভেতরে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে কয়েকজন কারারক্ষী লাঠি দিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালান। এতে তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে।
তবে অভিযোগটির বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার অভিযোগ, এর কারণ এবং কারা কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে কারাগারের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে অন্তত পাঁচজন কারারক্ষী তারেক সাঈদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। লাঠি দিয়ে মারধরের ফলে তিনি শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
কারাসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা জানান, কারাগারের ভেতরে একজন বন্দীকে ব্যবহার করে জেল সুপারের ওপর নোংরা পানি নিক্ষেপের ঘটনায় তারেক সাঈদের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ ওঠে। এর জেরেই তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে ওই সূত্রের দাবি।
তবে তারেক সাঈদের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিষয়ে তারেক সাঈদের আগ্রহের কারণে তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ বা কারা কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে হামলা হয়েছে—এমন দাবিকে আপাতত পরিবারের অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
সাত খুনের মামলায় তারেক সাঈদের অবস্থান
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং পরদিন উদ্ধার হয় আরেকজনের মরদেহ।
এই ঘটনায় করা মামলায় র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।
পরে হাইকোর্ট তারেক সাঈদসহ ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন করে ট্রাইব্যুনালের মামলায়ও আলোচনায়
তারেক সাঈদ বর্তমানে শুধু সাত খুন মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবেই নয়, গুম ও কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগসংক্রান্ত পৃথক মামলাতেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের মুখোমুখি হচ্ছেন।
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। ওই দিন তাঁকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি অন্য একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
এর আগে ১০ আগস্ট তাঁকে গুম ও ক্রসফায়ারসংক্রান্ত দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার আবেদন
তারেক সাঈদের মা দিলুয়ারা বেগম কারা কর্তৃপক্ষকে কথিত নির্যাতনের বিষয়ে অবহিত করেছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে গুরুতর আহত তারেক সাঈদের উন্নত চিকিৎসার জন্য মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
পরিবারের পক্ষ থেকে কারা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া আবেদনের কপি ও ঘটনার বিষয়ে কথিত প্রমাণ হিসেবে কিছু নথি/স্ক্রিনশট থাকার কথা জানানো হয়েছে। এসব নথির সত্যতা ও বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
কারাগারের মতো নিয়ন্ত্রিত স্থানে একজন বন্দীর ওপর এ ধরনের হামলার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি কেবল পারিবারিক অভিযোগ হিসেবে রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগটি সত্য হলে কারাগারের নিরাপত্তা, বন্দীর অধিকার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি—সবকিছু নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।
ঘটনাটি যাচাই করতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—
- ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে কারাগারের বিদ্যুৎ সংযোগ কেন বন্ধ হয়েছিল এবং কতক্ষণ বন্ধ ছিল;
- ওই সময় কারাগারের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো সচল ছিল কি না;
- তারেক সাঈদের সেলে ওই রাতে কারা কর্মকর্তা বা কারারক্ষীদের প্রবেশের রেকর্ড কী;
- কারা রেজিস্টারে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা ঘটনার নথি করা হয়েছে কি না;
- তারেক সাঈদের শরীরে আঘাতের বিষয়ে কারা চিকিৎসকের মেডিকেল রেকর্ড কী বলছে;
- পরিবারের পক্ষ থেকে সিভিল সার্জনের কাছে করা আবেদনের পর কোনো চিকিৎসা পরীক্ষা হয়েছে কি না;
- হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়েছে কি না;
- কারাগারের জেল সুপারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কারা কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী;
- কথিত হামলার সময় কারাগারের বিদ্যুৎ, সিসিটিভি ও ডিউটি রোস্টারের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মেলে কি না।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
তারেক সাঈদ সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি—এটি আদালতের রায়ে প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা কোনো বন্দীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সেটিও যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগটি সত্য হলে কারা হেফাজতে নির্যাতনের দায় নির্ধারণ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আবার অভিযোগের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা তথ্য থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বিশেষ করে ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার মাত্র একদিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে কথিত হামলার অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটির সময়ক্রমও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে এই দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীন প্রমাণ বর্তমানে পাওয়া যায়নি।
তাই মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতের কথিত নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে কারা অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের স্বাধীন তদন্ত, মেডিকেল পরীক্ষার ফল এবং সিসিটিভি ও ডিউটি রেকর্ড প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার করার দাবি উঠেছে।









Discussion about this post