নারায়ণগঞ্জের দুই সাবেক এসপির পুলিশি ক্যারিয়ারের অবসান
অনুপস্থিতি, বিভাগীয় মামলা ও তদন্তের পর চাকরি গেল গোলাম মোস্তফা রাসেল ও জায়েদুল আলমের
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালন করা দুই সাবেক পুলিশ সুপার—গোলাম মোস্তফা রাসেল ও মোহাম্মদ জায়েদুল আলম—শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরি হারিয়েছেন।
তবে দুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময়কাল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এক নয়।
একজনের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে সাময়িক বরখাস্তের পর ২০২৬ সালে বিভাগীয় তদন্ত শেষে চূড়ান্ত বরখাস্ত করা হয়েছে; অন্যজনের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসেলের বিরুদ্ধে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত
গোলাম মোস্তফা রাসেল ২০২২ সালের ৩ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট তাকে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
এরপর দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ২০২৫ সালের জুনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(গ) অনুযায়ী ‘পলায়নের অপরাধে’ অভিযুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ ২০২৫ সালের আদেশটি ছিল সাময়িক বরখাস্ত; তখনই তার সরকারি চাকরি স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে যায়নি।
এক বছর পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের নতুন প্রজ্ঞাপনে রাসেলের বিরুদ্ধে আরও এগিয়ে চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত অবস্থায় তিনি ৩১ মার্চ ২০২৫ থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তাকে হোয়াটসঅ্যাপ, ডাক ও ই-মেইলের মাধ্যমে নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি লিখিত জবাব দেননি এবং কর্মস্থলেও যোগ দেননি।
এরপর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর ০২৫/২০২৫ দায়ের করা হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শের পর রাষ্ট্রপতি বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। ফলে ৩১ মার্চ ২০২৫ থেকে কার্যকর ধরে তাকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
জায়েদুল আলমের ক্ষেত্রেও অনুপস্থিতির অভিযোগ
অন্যদিকে, মোহাম্মদ জায়েদুল আলম নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ছিলেন ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত। পরে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব ছাড়েন।
তার বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জায়েদুল আলম ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগে ১২ অক্টোবর চিকিৎসার জন্য ছুটি নিয়ে তিনি থাইল্যান্ডে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ছুটি শেষ হলেও তিনি দায়িত্বে ফিরে আসেননি। কর্তৃপক্ষ ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি।
পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্ত শেষে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগে একাধিক কর্মকর্তা
জায়েদুল আলম একা নন। একই সময়ে আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, ছুটি শেষে কাজে যোগ না দেওয়া এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মোট ছয়জন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি জায়েদুল আলম, সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান, সাবেক এসপি আরিফুর রহমান মণ্ডল, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রাজীব দাস, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে।
নারায়ণগঞ্জ অধ্যায়ের শেষ পরিণতি
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাসেল ও জায়েদুল আলম—দুজনই একসময় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের চাকরি থেকে চূড়ান্ত বরখাস্তের ঘটনাটি তাই শুধু ব্যক্তিগত প্রশাসনিক শাস্তির বিষয় নয়; এটি পুলিশ বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলা প্রয়োগেরও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
তবে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা অন্য কোনো অভিযোগের কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে—এমন তথ্য এই বরখাস্তের প্রজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিবেদনে নেই। বর্তমানে যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত বরখাস্তের মূল ভিত্তি হলো দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, পলায়ন ও অসদাচরণের অভিযোগ এবং বিভাগীয় তদন্তে তা প্রমাণিত হওয়া।
এ কারণে ‘পুলিশ থেকে পরিষ্কার’ কথাটির পরিবর্তে সংবাদ প্রতিবেদনে ‘চাকরি থেকে বরখাস্ত’ বা ‘চূড়ান্ত বরখাস্ত’ শব্দ ব্যবহার করাই তথ্যগতভাবে অধিক নির্ভুল।









Discussion about this post