‘নামাজে ব্যস্ত, দায়িত্বে শূন্য’—নারায়ণগঞ্জ ডিপিডিসিতে সেবার নামে প্রহসন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
“চুরি মেরা পেশা হ্যায়, নামাজ মেরা ফরজ হ্যায়”—এক সময়ের চলচ্চিত্রের সংলাপ, আজ যেন বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জের বিদ্যুৎ সেবা ব্যবস্থায়।
বাইরে ধর্মীয় আবরণ, ভেতরে দায়িত্বহীনতা, দুর্নীতি ও চরম অব্যবস্থাপনার এক নগ্ন চিত্র—এভাবেই বর্ণনা করছেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর অধীন নারায়ণগঞ্জের কিল্লারপুল কার্যালয় এখন যেন সেবার কেন্দ্র নয়, বরং ভোগান্তির এক অঘোষিত কারখানা।
গ্রাহকসেবার নামে সেখানে যা চলছে, তা শুধু অবহেলা নয়—বরং জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রহসন।
সম্প্রতি ফ্যাশন হাউজ ‘নকশা’র স্বত্বাধিকারী এটিএম জামালের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে উঠে এসেছে এমনই এক হতবাক করা অভিজ্ঞতা।
একটি সাধারণ বিদ্যুৎ বিল সংশোধনের জন্য তাঁকে দৌড়াতে হয়েছে এক তলা থেকে আরেক তলায়, এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে। অথচ বিশাল অফিসজুড়ে জ্বলছে লাইট, ঘুরছে ফ্যান, চলছে এসি—কিন্তু নেই কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারী।
দুপুর ১টা ২০ মিনিটে পুরো অফিস ফাঁকা। কারণ—“সবাই নামাজে”।
প্রশ্ন হলো, নামাজ কি দায়িত্ব পালনের বিকল্প ? ধর্মীয় অনুশাসন কি সরকারি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির লাইসেন্স ? আর যদি সবাই নামাজেই থাকেন, তাহলে জনগণের টাকায় চালিত বিদ্যুৎ অপচয়ের এই উৎসব কেন ?
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর জানা গেল, সংশ্লিষ্ট কাজটি এই কার্যালয়ে হয়ই না—যেতে হবে কাঁঠালতলায়।
সেখানে পৌঁছে আবারও একই চিত্র—“সবাই খেতে গেছেন।”
অর্থাৎ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার এক অবিরাম চক্র, যেখানে গ্রাহকই একমাত্র ভুক্তভোগী।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতাহীনতারই ধারাবাহিক ফল। যেখানে একটি মৌলিক সেবা পেতে একজন নাগরিককে দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হতে হয়, সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অব্যবস্থাপনা যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। দায়িত্বশীলদের অনুপস্থিতি, কাজের প্রতি চরম উদাসীনতা এবং গ্রাহকের সময় ও দুর্ভোগকে তুচ্ছজ্ঞান করার মানসিকতা—সব মিলিয়ে এটি একটি ভয়াবহ প্রশাসনিক ব্যর্থতার চিত্র।
নগরীর এক প্রবীণ বিদ্যুৎ গ্রাহকের ভাষায়, “এরা লেবাসধারী বাটপার। বাইরে ধার্মিকতার মুখোশ, ভেতরে দায়িত্বহীনতার কারখানা।
‘চুরি মেরা পেশা হ্যায়, নামাজ মেরা ফরজ হ্যায়’—এই সংলাপই যেন তাদের জন্য তৈরি।”
প্রশ্ন এখন একটাই—এই দায় নেবে কে ? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আসবেন? নাকি ধর্মের আড়ালে লুকিয়ে এভাবেই চলতে থাকবে দায়িত্বহীনতার মহড়া ?
কিল্লারপুল ডিপিডিসি কার্যালয়ের এই চিত্র শুধু একটি অফিসের নয়—এটি পুরো সেবাব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
অবিলম্বে এই ঘটনায় তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে, এ ধরনের অনিয়ম আরও বিস্তার লাভ করবে। আর সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হয়েই যাবে—নিঃশব্দে, নিরুপায়ে।









Discussion about this post