নারায়ণগঞ্জে ‘ছিনতাইকারী’ তকমায় খুঁটিতে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা : উস্কানিদাতার প্রকাশ্য দম্ভ, নীরবতায় প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা
স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম মাসদাইরে প্রকাশ্য জনসমক্ষে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা শুধু একটি নৃশংস অপরাধই নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে জিসান (২৫) নামের এক যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন অনিক নামের আরেক তরুণ, যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শনিবার (৪ জুলাই) রাতে সংঘটিত এই বর্বরোচিত ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড এবং ২৭ সেকেন্ডসহ একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, দুই তরুণকে বিদ্যুতের খুঁটিতে রশি দিয়ে বেঁধে স্টিলের পাইপ ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হচ্ছে। উপস্থিত কেউই এই নিষ্ঠুরতা থামানোর চেষ্টা করেনি—বরং নির্যাতন যেন ‘জনতার বিচার’ নামে বৈধতা পেয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জিসান ও অনিককে তাঁদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবে ‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে খুঁটিতে বেঁধে ফেলা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠনের নেতা ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম কাউছার কাসেমীর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ দল এই নির্মম হামলা চালায়। মারধরের একপর্যায়ে জিসান গুরুতর আহত হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহতের বাবা ইউনুস মিয়ার অভিযোগ, তাঁর ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের আকুতি-অনুরোধ সত্ত্বেও হামলাকারীরা দয়া দেখায়নি। তিনি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
ঘটনার পর আরও বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক দিক সামনে আসে। অভিযুক্ত ইমাম কাউছার কাসেমী হ্যান্ডমাইকে প্রকাশ্যে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই বক্তব্যে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘হামলা জনগণ করেছে। কুত্তাকে জনগণ পিটিয়ে মেরেছে, কোনো মামলা-হামলা কিচ্ছু হবে না।’
তিনি বলেন, ‘যখন ঐক্য থাকে, তখন বাংলাদেশের প্রশাসন কী, কোনো কুত্তায়ও আমাদের কিছু করতে পারবে না।’
এমন দম্ভোক্তি শুধু মানবিকতার চরম অবমাননাই নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলার প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, ভুক্তভোগীদের কাছে অভিযুক্তদের কিছু আপত্তিকর ভিডিও ছিল, যা কেন্দ্র করে ব্ল্যাকমেইলের জেরে এই ‘গণপিটুনি’র নাটক সাজানো হতে পারে। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও ঘটনাটির পেছনে পরিকল্পিত প্রতিশোধের ইঙ্গিত উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার পরদিন (৫ জুলাই) ফতুল্লা থানার গেট সংলগ্ন এলাকায় অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলনের উদ্যোগ এবং সংবাদ প্রচারে প্রভাব বিস্তারের জন্য অর্থ প্রস্তাবের অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
একাধিক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও এমন প্রকাশ্য ‘প্রভাব খাটানোর’ চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও যদি হত্যাকারীরা থানার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করতে পারে, তাহলে আইনের অস্তিত্ব কোথায় ?”
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, নিহত জিসানের বিরুদ্ধে একটি মামলা থাকলেও কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ কতটা দ্রুত ও কার্যকর হবে ?
জনতার নামে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস, প্রকাশ্য উস্কানি, ভিডিও প্রমাণ, এমনকি প্রভাব খাটানোর অভিযোগ—সবকিছুর পরও যদি দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘গণবিচার’ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একজন জিসানের জীবনই কেড়ে নেয়নি—এটি সমাজে আইনের শাসন, মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।









Discussion about this post