আধিপত্যের দ্বন্দ্বে দুই ভাই বহিষ্কার, সোনারগাঁয়ে বিএনপির রাজনীতিতে রক্তাক্ত বিভাজন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
সোনারগাঁয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আপন দুই ভাইয়ের অনুসারীদের সংঘর্ষের জের এবার গড়াল সাংগঠনিক বহিষ্কার পর্যন্ত।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, দলীয় কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর এবং একাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়ার ঘটনার মাত্র তিন দিনের মাথায় সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির দুই নেতাকে সব দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কৃতরা হলেন—সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ এবং উপজেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক ও পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিল। তারা সম্পর্কে আপন দুই ভাই।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান ও সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার আষাঢ়িয়ারচর এলাকায় রউফ ও জলিলের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হন। একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। গুরুতর আহত একজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। ব্যক্তিগত সেই দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে এবং তাদের অনুসারীদের মধ্যেও একাধিকবার সংঘর্ষের জন্ম দেয়।
ফলে রাজনৈতিক বিরোধের আড়ালে এলাকায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের আতঙ্ক ও অস্থিরতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিরোধটি শুধু মারামারি বা দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অতীতেও দুই পক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগসহ গুরুতর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও বিরোধের স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
বুধবারের সংঘর্ষে আব্দুর রউফ পক্ষের আবুবক্কর সিদ্দিক, মফিজুল ইসলাম, ইয়ানবী, বাবুল হোসেন ও রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুল জলিল পক্ষের সবুর খান ও আব্দুল লতিফসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
আব্দুর রউফের দাবি, প্রতিপক্ষের লোকজন এর আগেও তার অনুসারীদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে এবং তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। প্রায় দুই মাস পর তিনি দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেওয়ার সুযোগে প্রতিপক্ষ অতর্কিত হামলা চালায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আব্দুল জলিলের দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে তার এক অনুসারীকে একা পেয়ে প্রতিপক্ষ হামলা চালায়। পরে তাকেও দলীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে মারধর করা হয়। আশপাশের লোকজনের চিৎকারে তাকে উদ্ধার করা হয়।
দুই পক্ষই সংঘর্ষের জন্য পরস্পরকে দায়ী করলেও ঘটনার পর এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়নি।
সোনারগাঁ থানার ওসি (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। লিখিত অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সংঘর্ষের তিন দিন পর দলীয়ভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিল উপজেলা বিএনপি। বহিষ্কার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বহিষ্কৃত দুই নেতার সঙ্গে দলের কোনো নেতাকর্মী সাংগঠনিক যোগাযোগ রাখতে পারবেন না। ভবিষ্যতে তারা দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে কিংবা কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সাংগঠনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন জানান, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দলের সুনাম, ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা দুই সহোদরের ব্যক্তিগত আধিপত্যের দ্বন্দ্ব যখন বারবার সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—দলীয় পরিচয়ের আড়ালে চলা এই ক্ষমতার লড়াই থামাবে কে? স্থানীয়দের আশঙ্কা, এবার সাংগঠনিক বহিষ্কারের পরও বিরোধের মূল কারণের সমাধান না হলে সোনারগাঁয়ে এ দ্বন্দ্ব আরও ভয়াবহ সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।









Discussion about this post