পিবিআইয়ের জালে চক্রের মূলহোতা, ভুয়া পরিচয়-ব্যাংক হিসাবের তথ্য
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
ঠিকাদারি কাজ ও বড় বড় সরকারি প্রকল্পে অংশীদার করার প্রলোভন দেখিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাবেদকে গ্রেপ্তার করেছে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকা থেকে গত ১৯ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, প্রতারক চক্রটি নিজেদের ঠিকাদার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীদের টার্গেট করত। এরপর ঢাকা সিটি করপোরেশনের লাইটিং স্থাপন, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, বিমানবন্দরের লাইটিং, বালু ভরাট এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পাথর সরবরাহসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে অংশীদার করার কথা বলে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো।
চক্রটির কথিত ‘অফিস’ ছিল রাজধানীর উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে ‘ওরিয়ান কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), ছয়জন প্রকৌশলীসহ প্রায় ১৫ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ দল সক্রিয় ছিল।
পরিচয় থেকে কোটি টাকার ফাঁদ
মামলার বাদী মো. মিজানুর রহমান নিজেও পেশায় ঠিকাদার। পিবিআই সূত্র জানায়, ২০২২ সালে তাঁর সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীর নিজেকে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বড় প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বলেন।
একপর্যায়ে মিজানুর রহমানকে বিভিন্ন প্রকল্পে অংশীদার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কথিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল ঢাকা সিটি করপোরেশনের লাইটিং স্থাপন, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন, বিমানবন্দরের লাইটিং এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পাথর সরবরাহের মতো কাজ।
এই প্রস্তাবে বিশ্বাস করে মিজানুর রহমান চেকের মাধ্যমে চক্রটির কাছে মোট ৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা দেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
কিন্তু টাকা পাওয়ার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। পিবিআইয়ের দাবি, অর্থ গ্রহণের পর জাহাঙ্গীর ও তাঁর সহযোগীরা উত্তরার অফিস বন্ধ করে দেন। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন বন্ধ করে তারা আত্মগোপনে চলে যান। তখনই প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।
এক মামলায় তদন্তের মোড় পিবিআইয়ে
ঘটনার পর ফতুল্লা থানায় মামলা করেন মিজানুর রহমান। গত ১০ আগস্ট মামলাটির তদন্তভার নেয় পিবিআই নারায়ণগঞ্জ।
তদন্তে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে জাহাঙ্গীরের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে গত ১৯ আগস্ট রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
পিবিআইয়ের দাবি, গ্রেপ্তারের পর এক দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে জাহাঙ্গীর ৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছেন। তবে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই স্বীকারোক্তিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
ভিন্ন পরিচয়ে একাধিক ব্যাংক হিসাব!
তদন্তে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পিবিআই। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর নামে ভিন্ন পরিচয়ে ১০ থেকে ১২টি ব্যাংক হিসাব, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একাধিক মোবাইল নম্বর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ধরনের একাধিক পরিচয় ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের অভিযোগের কারণে তদন্তকারীদের কাছে অর্থের গতিপথ, চক্রের অন্য সদস্য এবং প্রতারণার পরিধি খতিয়ে দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কেবল একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা কি না, নাকি একই কায়দায় আরও ব্যবসায়ীকে টার্গেট করা হয়েছে—তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
টার্গেটে স্বনামধন্য ব্যবসায়ী
পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল রাশেদ বলেন, তদন্তে জাহাঙ্গীর আলমকে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন সক্রিয় সদস্য জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি স্বনামধন্য ব্যক্তিদের টার্গেট করে বিভিন্ন প্রকল্পের কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিত। চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
রিমান্ড শেষে গত ২১ আগস্ট জাহাঙ্গীর আলমকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
প্রশ্ন উঠছে কথিত প্রকল্পগুলোর অস্তিত্ব নিয়েও
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—যেসব সরকারি ও বড় প্রকল্পের কথা বলে কোটি কোটি টাকা নেওয়া হয়েছিল, সেসব প্রকল্পে আদৌ জাহাঙ্গীর বা তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ সম্পৃক্ততা ছিল কি না।
পিবিআইয়ের তদন্তে যদি প্রকল্পগুলোর নামে ভুয়া কাগজপত্র, পরিচয় বা চুক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রতারণার কৌশল ও চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
একই সঙ্গে ‘ওরিয়ান কনস্ট্রাকশন’ প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের পরিচয়, ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অর্থ লেনদেনের নথিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
আরও ভুক্তভোগী আছেন কি না, তদন্তে নজর
৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই চক্রের প্রতারণার শিকার কি শুধু একজন ব্যবসায়ী, নাকি আরও অনেকে রয়েছেন?
পিবিআই বলছে, চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের প্রতারণার পুরো নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যদি আরও ভুক্তভোগী, ব্যাংক হিসাব কিংবা কথিত প্রকল্পের তথ্য বেরিয়ে আসে, তাহলে মামলাটির পরিধি আরও বড় হতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা, অর্থের প্রকৃত গন্তব্য এবং চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের ভূমিকা তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াতেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
[প্রতিবেদনটি পিবিআইয়ের বক্তব্য, মামলার তথ্য ও উন্মুক্ত উৎসে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো বিচারাধীন; আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।]









Discussion about this post