নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
মাত্র ২৭৮ দিনের দায়িত্ব শেষে বদলিজনিত কারণে নারায়ণগঞ্জ ছাড়লেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ থেকে ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—হিসাব অনুযায়ী ৯ মাস ৫ দিন বা ২৭৮ দিন তিনি জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু বিদায়ের মুহূর্তে ফুলেল শুভেচ্ছা, সংবর্ধনা ও সম্মাননা স্মারকের আড়ালে এখন জেলা পুলিশের ভেতরে-বাইরে উঠছে ভিন্ন প্রশ্ন—এসপি চলে গেলেও তার কথিত ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট’ কি রেখে গেলেন নারায়ণগঞ্জে জেলা ?
দায়িত্বকালজুড়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা মহলে অসন্তোষ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন। কোথাও কোথাও বাহিনীর সদস্যরা আহত ও রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। অথচ এত কিছুর পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জেলা পুলিশের অভ্যন্তরীণ একটি কথিত ‘ক্যাশিয়ার চক্র’ নিয়ে। পুলিশের বিভিন্ন স্তরে এ চক্রকে অনেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘কুমিল্লা সিন্ডিকেট’ নামে উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কুমিল্লা সিন্ডিকেটের মোট দায়িত্ব ছিল নানা সেক্টর থেকে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে তার শিশু কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া।
যেমন বিভিন্ন চোরাই কারবারি, মাদক ব্যবসায়ী ভূমি দস্যু, মামলা বাস সিন্ডিকেটের সাথে হঠাৎ করে অর্থ হাতে নিয়ে তুই অর্থ ফোন টোন করার কর্মে লিপ্ত ছিলেন কুমিল্লা সিন্ডিকেটের কয়েকজন কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, জেলার বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ইউনিটে প্রভাব বিস্তার করে একটি বিশেষ বলয় গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এই বলয়ের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অবৈধ সুবিধা ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়ালেও কার্যকর কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত দৃশ্যমান হয়নি।
এদিকে পরিবহন সেক্টর নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতে অনিয়ম ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সঙ্গে জেলা পুলিশের কিছু সদস্যের নাম আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ট্রাফিক প্রশাসনের এক কর্মকর্তা আবদুল করিম কে ঘিরে বিভিন্ন মহলে ‘ক্যাশিয়ারদের মূল সমন্বয়ক’ হিসেবে অভিযোগ ছড়িয়েছে।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তিনি ২৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। কর্মজীবনে কক্সবাজারের উখিয়া সার্কেল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি পিবিআই নোয়াখালীর পুলিশ সুপার এবং পঞ্চগড় জেলার পুলিশ সুপার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোতে তার দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ইতিবাচক মূল্যায়নের কথাও রয়েছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে তার দায়িত্বকালে এসে কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এত প্রশ্ন তৈরি হলো এবং কেন তার অধীনে কথিত একটি আর্থিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ সামনে এলো—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রভাব এবং অবৈধ আর্থিক সুবিধার প্রলোভনে জেলা পুলিশের ভেতরে একটি সুবিধাভোগী বলয় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীকে বদলি করা হলেও নারায়ণগঞ্জে টিকে থাকতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যাপক তদবির করে মিজানুর রহমান মুন্সী ও তার কুমিল্লা সিন্ডিকেট চক্।
জোরালো তথ্যের ব্যর্থতার পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জের নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মাদারীপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান। বিদায়লগ্নে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মিজানুর রহমান মুন্সীকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—বিদায়ী এসপির হাতে সম্মাননা স্মারক উঠেছে, কিন্তু তার দায়িত্বকালে গড়ে ওঠার অভিযোগ থাকা কথিত ‘ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেটের’ বিরুদ্ধে কি কোনো তদন্ত হবে ?
আরও বড় প্রশ্ন, মিজানুর রহমান মুন্সী বদলি হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার কথিত বলয়ের সদস্যরা যদি নারায়ণগঞ্জেই থেকে যান, তাহলে কি বদলি হবে শুধু একজন এসপি—নাকি থেকে যাবে পুরোনো সিন্ডিকেট, পুরোনো প্রভাব আর পুরোনো অর্থবাণিজ্য ?
নতুন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের সামনে তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জেলা পুলিশের অভ্যন্তরে ওঠা এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখারও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রয়োজন হলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২৭৮ দিনের দায়িত্ব শেষে একজন পুলিশ সুপার বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন এখনো বিদায় নেয়নি—‘ক্যাশিয়াররা’ কি রয়ে গেলেন ? আর রয়ে গেলে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনবে কে ?








Discussion about this post