ভূমি অফিসে ‘আগাম হাজিরা’ কেলেঙ্কারি: তদন্তের আগেই অভিযুক্তদের রক্ষার অভিযোগ ডিসির বিরুদ্ধে
নগর প্রতিনিধি
ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জে দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ ২০ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ঘটনায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ঘটনার তিন দিন পর বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের ভেতর থেকেই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—পুরো ঘটনার প্রকৃত দায় ও এর পেছনের অনিয়ম আড়াল করতে জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে নানাভাবে তৎপরতা চলছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও সরকারি তদন্তে এখনো সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।
গত ৩১ আগস্ট সকালে নারায়ণগঞ্জ নগরীর খানপুরে সদর উপজেলা ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে যান ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
সকাল ৯টার কয়েক মিনিট আগে অফিসে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে উপস্থিত নেই। অথচ হাজিরা খাতায় তাদের স্বাক্ষর রয়েছে।
সকালে প্রতিমন্ত্রীর পর দুপুরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নারায়ণগঞ্জের ভূমি কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
এ ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে দুই এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় জেলা প্রশাসন।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—শুধু নিচের সারির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শোকজ করলেই কি শেষ হয়ে যাবে আগাম হাজিরা ও দীর্ঘদিনের অনিয়মের অনুসন্ধান ? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়া ?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভেতরে ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তাদের দাবি, ভূমি অফিসকেন্দ্রিক অনিয়ম বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক বলয়ের প্রভাব ও তদারকির অভিযোগ রয়েছে।
এক কর্মকর্তা আতঙ্কের সঙ্গে বলেন,
“ভূমি অফিসে কী হচ্ছে, কার মাধ্যমে কী ধরনের কাজ হচ্ছে—এসবের খবর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছায় না, এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। এখন ধরা পড়ার পর দায় কয়েকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে পুরো বিষয়টি সীমিত করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্ত হওয়া দরকার।”
অভিযোগ রয়েছে, ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদ এবং জীবনযাত্রা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, ভূমি অফিসকেন্দ্রিক অনিয়ম, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, দালালচক্র এবং বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এমন অভিযোগের পর বিগত সময়ে ৪২ লাখ টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারি এবং ৩২ লাখ টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়ার পরও কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারীকে এবং একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে বদলি করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনান কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাই। পুনরায় ওই চক্রের সদস্যদের একই পদে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
ভূমি অফিসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রদানের ক্ষেত্রেও লাখ লাখ টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারির খবর সকলের মুখে মুখে রয়েছে। মধ্যরাত্রে কুখ্যাত ভূমি অফিসের কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র কে জেলা প্রশাসকের ডাকবাংলায় ২০ লাখ টাকার লেনদেনের খবর চাউর হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাই।
নগরবাসীর প্রশ্ন, যদি একজন কর্মকর্তা অফিসে না থেকেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে পারেন, তাহলে সেই অনিয়ম কতদিন ধরে চলছে? কারা বিষয়টি দেখেও দেখেননি ? আর প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল ?
অভিযোগকারীদের মতে, কেবল ৩১ আগস্টের একটি সকালের ঘটনা তদন্ত করলেই প্রকৃত চিত্র বের হবে না। তাদের দাবি, ভূমি অফিসগুলোর হাজিরা খাতা, অফিসে প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ নথি নিষ্পত্তির সময়সূচি, রাজস্বসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের তথ্য দীর্ঘ সময়ের জন্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এক কর্মকর্তা বলেন,
“একদিনের আগাম স্বাক্ষর ধরা পড়েছে বলেই সবাইকে শোকজ করা হয়েছে। কিন্তু এর আগে কী হয়েছে, কতদিন ধরে হয়েছে এবং কার প্রশ্রয়ে হয়েছে—সেটি বের না হলে তদন্তের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।”
আরও অভিযোগ উঠেছে, ভূমি অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অভিযোগগুলো দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে থাকে। ফলে মাঠপর্যায়ে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে।
তবে জেলা প্রশাসক রায়হান কবির এসব অভিযোগের বিষয়ে আগে বলেছেন, ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কারণ জানার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সবাই হয়তো একই ধরনের অপরাধ করেননি এবং তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
এদিকে অনুসন্ধানে উঠে আসা নতুন অভিযোগগুলোর বিষয়ে জেলা প্রশাসক রায়হান কবিরের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—আগাম স্বাক্ষরের ঘটনায় তদন্ত কি শুধু ২০ জনের কারণ দর্শানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভূমি প্রশাসনের পুরো অনিয়মের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাবে ?
ভূমি অফিসে প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে যে অনিয়ম প্রকাশ্যে এসেছে, তা কেবল সময়মতো অফিসে না আসার ঘটনা, নাকি এর আড়ালে আরও বড় কোনো প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির চিত্র লুকিয়ে আছে—নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিস্তৃত তদন্ত ছাড়া তার উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তকে বিশ্বাসযোগ্য করতে জেলা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার বাইরে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি, হাজিরা ব্যবস্থাপনা, ভূমি অফিসের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অভিযোগ ওঠা অনিয়মগুলো নথিপত্রসহ যাচাই করা হোক।
কারণ, আগাম স্বাক্ষর কেবল একটি হাজিরা জালিয়াতির অভিযোগ নয়—এটি প্রশাসনিক জবাবদিহির দরজায় কড়া নাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, সেই দরজা খুলে সত্য বেরিয়ে আসে, নাকি তদন্তের আড়ালেই চাপা পড়ে যায় পুরো ঘটনা।








Discussion about this post