আগাম স্বাক্ষর বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই ইউএনও কার্যালয়ে আগুন
পুড়েছে কম্পিউটার-ল্যাপটপসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি, প্রশ্নে সরব নানা মহল
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসনকে ঘিরে সম্প্রতি সৃষ্ট আগাম স্বাক্ষর বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
আগুনে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ল্যাপটপ, এসিসহ বিভিন্ন মূল্যবান সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুটি ঘটনার সময়গত ব্যবধান কম হওয়ায় প্রশাসনিক মহলসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন সদর ভূমি কার্যালয়কে কেন্দ্র করে আগাম স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে যখন ব্যাপক সমালোচনা চলছিল, ঠিক সেই সময় ইউএনও কার্যালয়ে আগুনের ঘটনায় ঘটনার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি উঠেছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাত প্রায় ৮টার দিকে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে অবস্থিত ইউএনও কার্যালয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের দিকে কার্যালয়ের ভেতর থেকে বিকট শব্দ শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর বাইরে অবস্থানরত লোকজন অফিসকক্ষের ভেতরে আগুন জ্বলতে দেখতে পান। তারা প্রথমে নিজেদের উদ্যোগে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন এবং বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
অগ্নিকাণ্ডে একটি কম্পিউটার, একটি প্রিন্টার, একটি ল্যাপটপ, দুটি এসি, সিসিটিভি মনিটর, সেক্রেটারি টেবিল, ফলস সিলিংসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পুড়ে গেছে। আগুনে কার্যালয়ে সংরক্ষিত কিছু জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কী ধরনের নথি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কতগুলো নথি পুড়েছে—সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল আরেফিন জানান, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দ্রুত তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে, এর আগে নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি কার্যালয়কে কেন্দ্র করে প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতির আগে আগাম স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় দুইজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রায় ২০ জনকে নিয়ে গঠিত একটি তদন্ত কার্যক্রমের কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যুগ্ম সচিব দেলোয়ার হোসেন মাতব্বরের নেতৃত্বে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।
আগাম স্বাক্ষর বিতর্ককে কেন্দ্র করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যখন জবাবদিহিতা ও তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে, তখন ইউএনও কার্যালয়ে আগুনে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে আগাম স্বাক্ষর বিতর্কের সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে প্রযুক্তিগত ও নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অগ্নিকাণ্ডকে শুধু ‘শর্টসার্কিট’ হিসেবে প্রাথমিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। আগুন লাগার সময় কার্যালয়ে কোন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন, আগুনের উৎসস্থল কোথায়, ক্ষতিগ্রস্ত সিসিটিভির ফুটেজ বা অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব কি না এবং কী কী গুরুত্বপূর্ণ নথি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত নথিপত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে আনা হলে জনমনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ও সন্দেহ দূর হবে।
একাধিক সূত্র বলছে, সদর ভূমি কার্যালয়ের আগাম স্বাক্ষর বিতর্ক এবং ইউএনও কার্যালয়ের অগ্নিকাণ্ড—দুটি পৃথক ঘটনা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে বিষয়গুলো নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এবং নথিপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।








Discussion about this post