দুই দিনেও মরদেহের সৎকার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেই, শুভ হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি ডিবির
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে নিহত শুভ চন্দ্র দাসের মরদেহ উদ্ধারের দুই দিন অতিবাহিত হলেও সৎকার নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান হয়নি।
বাবা হিন্দু ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী মরদেহ দাহ করার দাবি জানালেও ধর্মান্তরিত মা মুসলিম বিধান অনুযায়ী দাফনের দাবি জানিয়েছেন।
এ নিয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেছে সদর থানা পুলিশ।
তবে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টা পর্যন্ত আদালতের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মরদেহটি বর্তমানে সদর থানা পুলিশের হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে।
পরিবার ও পুলিশ সূত্র জানায়, শুভ চন্দ্র দাসের বাবা হরিপদ দাস হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ছেলের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে শুভর ধর্মান্তরিত মা আয়েশা বেগম মুসলিম বিধান অনুযায়ী মরদেহ দাফনের আবেদন করেন। শনিবার সন্ধ্যায় মরদেহ নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে পুলিশ মরদেহ জব্দ করে থানায় নিয়ে আসে।
পরবর্তীতে শুভর মায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সদর থানা পুলিশ আদালতের শরণাপন্ন হয়। ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও মতামত চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আদালতের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
এদিকে মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ববিরোধের জেরে শুভ চন্দ্র দাসকে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনার রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদঘাটন করেছে বলে দাবি করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশ জানায়, গত শনিবার রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে নগরীর চাষাঢ়ায় হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামন্দিরের সামনের রাস্তা থেকে শুভ চন্দ্র দাসের (৩০) গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর থানার গলাচিপা এলাকার হরিচাঁদ দাসের ছেলে।
ঘটনার পর ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিনুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল মাঠে নামে। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মো. সুমন ওরফে মাইগ্যা সুমন (৪৫), সিয়াম আহমেদ সিজান (২১) ও মো. সোহান (২৪) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল ও তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় ঘটনায় জড়িতদের সংখ্যা ও হত্যার পুরো পরিকল্পনা নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত বুধবার নগরীর এক মাদক ব্যবসায়ী ফতের বাড়িতে ডিবি পুলিশের একটি অভিযান পরিচালিত হয়। ওই অভিযানে শুভ তথ্যদাতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন বলে সন্দেহ করা হয়। এর পাশাপাশি মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পূর্ববিরোধ থাকায় শুভকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুভর সহযোগী হিসেবে পরিচিত সোহানকে ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেটের বিনিময়ে ব্যবহার করে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। পরে অনিক ও অহিদের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল সেখানে হামলা চালায় বলে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। এ সময় অনিক ও অহিদ গুলি চালান এবং অন্যরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে শুভর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে বলে পুলিশের দাবি।
তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, শুভ দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ডিবি পুলিশের সোর্স বা তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করতেন। সম্প্রতি নগরীর এক আলোচিত মাদক ব্যবসায়ীর আস্তানায় অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুভ নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় নানা প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর দুই দিন পার হলেও এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) হাসিনুজ্জামান বলেন, “ঘটনার তদন্ত ও অভিযান চলমান রয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।”
একদিকে শুভ হত্যাকাণ্ডের পেছনের মাদক সিন্ডিকেট ও পূর্ববিরোধের বিষয়টি তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ, অন্যদিকে তার মরদেহের শেষকৃত্য কোন ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন হবে—সেই প্রশ্নে এখন আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার ও পুলিশ। ফলে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি মরদেহের সৎকার নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতাও এখন আলোচনার কেন্দ্রে।








Discussion about this post