একদিকে দাফনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে দাহের দাবি
গুলিতে নিহত শুভর মরদেহ নিয়ে বাবা-মায়ের টানাটানি
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
চাষাঢ়ায় গুলিতে নিহত যুবক শুভ দাসের মরদেহ নিয়ে একদিকে যখন দাফনের প্রস্তুতি চলছিল, অন্যদিকে তখন ছেলের শেষকৃত্য হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করার দাবিতে থানায় ছুটে বেড়াচ্ছিলেন বাবা হরিপদ দাস।
মা ও বাবার ভিন্ন সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত নিহতের মরদেহের শেষকৃত্য নিয়ে তৈরি হয় নাটকীয় পরিস্থিতি।
দাফনের জন্য মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার পর বাবার দাবির মুখে তা ফের উদ্ধার করে সদর মডেল থানায় নিয়ে আসা হয় বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটসংলগ্ন এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শুভ দাসের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের বুকে গুলির চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলে দেখা দেয় নতুন জটিলতা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত শুভ দাস হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তবে তার মা আয়েশা বেগম ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর বর্তমানে পৃথকভাবে অন্যত্র সংসার করছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
ময়নাতদন্ত শেষে তিনি ছেলের মরদেহ নিয়ে মাসদাইর এলাকার একটি কবরস্থানে দাফনের উদ্যোগ নেন।
কবরস্থানে মরদেহ, থানায় বাবার দাহের দাবি
অন্যদিকে বিকেল থেকেই নিহতের বাবা হরিপদ দাস ছেলের মরদেহ পাওয়ার দাবিতে সদর মডেল থানায় অবস্থান করেন।
তার দাবি, ছেলে শুভ দাস হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার শেষকৃত্য দাহের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হোক।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে হরিপদ দাস কয়েকজন আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে থানায় উপস্থিত হন এবং ছেলের মরদেহের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। একদিকে তখন কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে থানায় বাবার দাহের দাবি—দুই পক্ষের ভিন্ন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তীব্র টানাপোড়েন।
একপর্যায়ে দাফনের আগে মরদেহ উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় নিয়ে আসা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে আইনগত প্রক্রিয়া ও পারিবারিক দাবির বিষয়টি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গুলিতে মৃত্যু, শেষকৃত্য নিয়ে নতুন নাটকীয়তা
নিহত শুভ দাস চাঁদপুরের মতলব থানার মতলব বাজার এলাকার বাসিন্দা। তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। পারিবারিক নানা জটিলতার মধ্যে একপ্রকার অনিশ্চিত জীবনযাপন করছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানিয়েছেন, শুভ দাসের বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির অভিযোগে চার থেকে পাঁচটি মামলা রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। মরদেহ তল্লাশি করে কিছু ইয়াবাও উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তবে গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনার চেয়েও শেষ মুহূর্তে শুভ দাসের মরদেহ নিয়ে বাবা-মায়ের দুই বিপরীত সিদ্ধান্ত এখন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একদিকে মায়ের দাফনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে বাবার দাহের দাবি—এক সন্তানের নিথর দেহকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি দাঁড়ায় দুই ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্যের প্রশ্ন।
গুলিতে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনের তদন্ত চলার পাশাপাশি শুভ দাসের মরদেহের শেষকৃত্য নিয়ে সৃষ্ট এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নারায়ণগঞ্জজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ধর্মীয় বিষয়টি বিবেচনা করে নিহতের মরদেহ সদর থানায় নিয়ে আনার পর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছাড়াও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে থানায় বৈঠক করছেন বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক কাজল মিয়া।








Discussion about this post