উচ্ছেদ অভিযান, নাকি ‘আইওয়াশ’?
সোনারগাঁয়ে ফের উঠছে চাঁদাবাজির অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, সোনারগাঁ :
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ফলের দোকানসহ প্রায় এক হাজার স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন ও সওজ।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
প্রশাসনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মহাসড়কের পাশে সওজের জায়গা দখল করে টংঘর নির্মাণ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করে আদতেছিলো।
এসব অবৈধ স্থাপনার কারণে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাতের নির্দেশনায় অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মামুন সরকার।
অভিযানে সওজের উপ-বিভাগীয় সহকারী প্রকৌশলী আল রাজি লিওন, সার্ভেয়ার দেওয়ান মোহাম্মদ সোহাগসহ সোনারগাঁ থানা পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মামুন সরকার জানান, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তবে উচ্ছেদের পরই প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সওজের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো দখল করে ব্যবসা চললেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি কোথায় ছিল—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
আরও কঠোর প্রশ্ন উঠেছে, যদি অবৈধ স্থাপনা এতদিন ধরে যানজট ও জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, অবৈধ দখলকে কেন্দ্র করে নিয়মিত অর্থ লেনদেনের একটি অঘোষিত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে।
তাদের ভাষায়, অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে কথিত চাঁদা বা সুবিধার অর্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছানোর অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দেখা জরুরি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সমালোচকদের ভাষায়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ যদি সত্যিই জনস্বার্থের অভিযান হয়, তাহলে সেটি এক দিনের প্রদর্শনী হলে চলবে না। উচ্ছেদের পর আবার একই জায়গায় দখলদারিত্ব ফিরে এলে পুরো অভিযানই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
তাদের আশঙ্কা, অতীতের মতো উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর যদি আবার নতুন করে টংঘর, দোকান কিংবা স্থাপনা গড়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—উচ্ছেদ করা হলো দখলমুক্ত করার জন্য, নাকি সাময়িকভাবে ‘আইওয়াশ’ করে নতুন করে দখলের সুযোগ তৈরির জন্য ?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যারা বছরের পর বছর সওজের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ?
শুধু স্থাপনা উচ্ছেদ করে দখলদারিত্বের মূল হোতাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মহাসড়কের জায়গা দখল করে যদি কেউ ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন, তাহলে দখলদার যেমন দায়ী, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে তা দেখেও ব্যবস্থা না নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ফলে এবার শুধু উচ্ছেদ নয়, দখলদারিত্বের নেপথ্যের ব্যক্তি, কথিত ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তারও তদন্ত দাবি করছেন অনেকে।
সোনারগাঁয়ে এবারের অভিযান তাই কেবল প্রায় এক হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ঘটনা নয়; বরং এটি সামনে নিয়ে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—মহাসড়কের সরকারি জমি এতদিন কার ছত্রছায়ায় দখলে ছিল এবং উচ্ছেদের পর তা আবার দখল ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায় ?
কারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে ছবি তোলা সহজ; দখলমুক্ত জমি দখলমুক্ত রাখা এবং দখলের নেপথ্যের চক্র ভেঙে দেওয়া—সেটিই প্রকৃত প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষা।









Discussion about this post