ডিপো থেকে পাম্প—মাঝপথেই তেল উধাও
ফতুল্লায় যমুনা-মেঘনা ডিপো ঘিরে ‘চোরাই তেল সাম্রাজ্যের’ অভিযোগ, সম্পদের পাহাড় রায়হান-সুমন-সুজনদের
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
সারাদেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকটে যখন সাধারণ মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, ঠিক সেই সময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) যমুনা ও মেঘনা ডিপোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চোরাই তেল চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পে যাওয়ার পথেই কৌশলে তেল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন পাম্প মালিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা; শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ফতুল্লার পঞ্চবটী এলাকার রায়হান, সুমন ও সুজনকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও যাদের জীবনযাপন ছিল সাধারণ, তাদের বর্তমান সম্পদ ও বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে এলাকায় ব্যাপক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তেল ব্যবসার আড়ালে তারা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব সম্পদের বৈধ উৎস কী—তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
ডিপো থেকে বের হওয়ার পরই বদলে যায় তেলের হিসাব ?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংকলরি ডিপো থেকে নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নির্জন স্থানে থামানো হয়। এরপর বিভিন্ন কৌশলে ট্যাংকলরি থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একই সাথে ট্যাংকলরির ভিতরে রয়েছে বিশেষ চেম্বার যেখানে তেলচুরির অভিনব কৌশল।
সূত্রের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ট্যাংকলরি থেকে প্রায় এক হাজার লিটার পর্যন্ত তেল সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু তেল চুরির ঘটনা নয়; একই সঙ্গে জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো একটি পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উধাও হলে তার হিসাব কোথায় মিলছে—এ প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।
‘আর.জে.টি এন্টারপ্রাইজ’ কি আড়াল ?
অভিযোগ রয়েছে, চোরাই তেলের কারবারকে বৈধ ব্যবসার আবরণ দিতে আর.জে.টি এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তেল পরিবহন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড রয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত ব্যবসা, মালিকানা কাঠামো, ট্যাংকলরির সংখ্যা, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং এসব সম্পদের সঙ্গে কথিত তেল চোরাচালানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অল্প সময়ে সম্পদের পাহাড়
স্থানীয়দের অভিযোগ, কথিত সিন্ডিকেটের সদস্যদের নামে ও বেনামে জমি, প্লট, বাড়ি, ট্যাংকলরি, মোটরসাইকেল ও বিলাসবহুল গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের অংশীদারত্বে একাধিক ট্যাংকলরি রয়েছে। রয়েছে বিপুল পরিমাণ জমি ও বিভিন্ন ধরনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ।
প্রশ্ন উঠছে—এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী? তাদের ঘোষিত আয় ও কর নথির সঙ্গে সম্পদের পরিমাণের কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না? সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন ও ভূমি রেকর্ড যাচাই করলে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলতে পারে।
সিনেমা হলের দোকানেই কথিত ‘অফিস’
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো, ফতুল্লার বনানী সিনেমা হলের একটি দোকান ভাড়া নিয়ে কথিতভাবে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, হলের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মিত অর্থ দিয়ে সেখানে কর্মকাণ্ড চালানো হয়।
এমনকি নাইটগার্ডের যোগসাজশে রাতের বেলায় সেখানে মাদকের আসর ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, দোকান ভাড়ার নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
গুদামেই জমছে চোরাই তেল ?
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, আফাজউদ্দিনের ওয়ার্কশপের সামনে একটি কথিত গোপন গুদামে চোরাই তেল মজুত করা হয়। রাতের বেলায় পিকআপ, মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনে করে সেখানে তেল আনা-নেওয়া করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যদি অভিযোগটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে অননুমোদিত স্থানে বিপুল পরিমাণ দাহ্য জ্বালানি সংরক্ষণ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করছে। ঘনবসতিপূর্ণ পঞ্চবটী এলাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদহানির কারণ হতে পারে।
ছবি তুললেই হামলার অভিযোগ
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, কথিত চোরাই তেল কারবারের ছবি বা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে সিন্ডিকেটের লোকজন বাধা দেয়। এমনকি রাজিব নামের এক ব্যক্তিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া ও শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণ করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযান হয়, মূল হোতারা কেন অধরা ?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও অভিযানের আগেই কথিত মূল হোতারা এলাকা ছেড়ে সরে যায়। ফলে আটক বা জব্দের ঘটনায় বড় মাছ বাদ পড়ে যায়—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায় চাপানো সমীচীন নয়। বরং অভিযান-পূর্ব তথ্য ফাঁসের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রায়হানের দাবি—‘আমি তেলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নই’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রায়হানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি তেলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নই। আমার বাবার তেলের গাড়ি রয়েছে। আপনারা এসে দেখে যান।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ও তার বক্তব্যের মধ্যে যে অসঙ্গতি রয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে সুমন, সুজন এবং অভিযোগে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়াও প্রয়োজন।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে আসল চিত্র
ফতুল্লার এই কথিত তেল সিন্ডিকেটের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে শুধু লোকদেখানো অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত তদন্ত। ডিপো থেকে ট্যাংকলরি ছাড়ার পর জিপিএস ট্র্যাকিং, চালান, ওজনের হিসাব, পাম্পে পৌঁছানোর পর মজুতের পরিমাণ এবং বিক্রয় রেকর্ড মিলিয়ে দেখলেই সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথাও তেল গায়েব হচ্ছে কি না, তার একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া সম্ভব।
পাশাপাশি কথিত সিন্ডিকেটের সদস্যদের ট্যাংকলরি, জমি, বাড়ি, ব্যাংক হিসাব ও আয়কর নথিও যাচাই করা প্রয়োজন। সম্পদের সঙ্গে বৈধ আয়ের অসঙ্গতি পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি আরও জোরালো হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা বলছেন, জ্বালানি তেল কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়—এটি জাতীয় সম্পদ। তাই ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য অনিয়মও জনস্বার্থের বিরুদ্ধে বড় অপরাধে পরিণত হতে পারে।
ফতুল্লার পঞ্চবটীতে কথিত এই ‘চোরাই তেল সাম্রাজ্য’ আসলে কতটা বিস্তৃত, কারা এর পেছনে রয়েছে এবং তেল সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় কোথায় দুর্বলতা কাজে লাগানো হচ্ছে—তা বের করতে এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ তদন্ত।









Discussion about this post