ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জে ‘জালাল মামা’র ছায়া
ক্ষমতার দাপট, নজরানা ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
মহানগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির নেপথ্যে প্রভাবশালী এক নাম হিসেবে আলোচিত ছিলেন ব্যবসায়ী হাজী জালাল উদ্দিন। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘জালাল মামা’ নামে। প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক পদে না থেকেও আওয়ামী লীগ আমলে স্থানীয় রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল—এমন অভিযোগ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিভিন্ন সূত্রের।
জালাল উদ্দিনকে সাবেক নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের মামা-শ্বশুর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব বিস্তারের কথা বিভিন্ন সময় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
২০১২ সালে সাংস্কৃতিক সংগঠক রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে করা একটি চেক প্রতারণার মামলার বাদী হিসেবেও জালাল উদ্দিনের নাম তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে আসে; ওই প্রতিবেদনে তাকে শামীম ওসমানের মামা-শ্বশুর হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শুধু আত্মীয়তার পরিচয় নয়, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় জেএমএস গ্লাস ফ্যাক্টরির চেয়ারম্যান হিসেবেও জালাল উদ্দিনের পরিচিতি ছিল। ২০১৭ সালের একটি সংবাদ প্রতিবেদনে ওই কারখানায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তাকে সভাপতিত্ব করতে দেখা যায়।
‘মামা’ পরিচয়েই বাড়ে প্রভাব
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শামীম ওসমান প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর জালাল উদ্দিনের রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে কিংবা শামীম ওসমানের আনুকূল্য পেতে জালাল উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। বিভিন্ন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও তার সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল—এমন দাবি রয়েছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জালাল উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
‘নজরানা’র অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা ও স্থানীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কথিত ‘নজরানা’ বা ভাগ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কেউ নিয়মিত অর্থ না দিলে তার ব্যবসা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নানা ধরনের চাপ তৈরি হতো। তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট আর্থিক নথি বা স্বাধীন তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জালাল উদ্দিনকে সিদ্ধিরগঞ্জে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মামলায় নাম আসার পর তিনি আড়ালে চলে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়।
নূর হোসেনের গাড়ি উদ্ধার, বাড়ে প্রশ্ন
জালাল উদ্দিনকে ঘিরে আলোচনার অন্যতম কারণ ২০১৪ সালের সাত খুনের ঘটনার পর তার মালিকানাধীন জেএমএস গ্লাস কারখানা থেকে একটি গাড়ি উদ্ধারের ঘটনা।
সে সময় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, কাঁচপুর-শিমরাইল এলাকার জেএমএস গ্লাস কারখানার ভেতর থেকে নূর হোসেনের সহযোগী হিসেবে পরিচিত নুরুজ্জামান জজ ওরফে ছোট মিয়ার ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করে পুলিশ। ওই প্রতিবেদনে কারখানার চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিনকে শামীম ওসমানের মামা-শ্বশুর হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে কোনো স্থানে গাড়ি পাওয়া যাওয়াই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়—এ বিষয়ে তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্তকে আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি।
‘ছায়া-ক্ষমতা’র অভিযোগ
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ছিল—সিদ্ধিরগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতির অনেক সিদ্ধান্তের নেপথ্যে জালাল উদ্দিনের প্রভাব কাজ করত। স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, থানা আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি অংশ নিয়মিত তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপরও তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল—এমন দাবি করেছেন কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি।
জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে ভূমি দখল, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও আইনগত অবস্থাও যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যবসা থেকে রাজনীতি—সবখানেই ‘হিস্যা’র অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগের তালিকা শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। আদমজী ইপিজেড, বিসিক, পরিবহন, বালু-পাথর ব্যবসা, বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মতো নানা খাতেও জালাল উদ্দিনের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বড় অংশই স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যনির্ভর। কোনো নির্দিষ্ট খাত থেকে তার অবৈধ অর্থ উপার্জনের পরিমাণ বা নিয়মিত ‘পার্সেন্টেজ’ নেওয়ার দাবির স্বাধীন প্রমাণ এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় একটি প্রতিবেদনে সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকায় ‘জালাল মামা’র নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেটিও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ; আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এখনো কি সক্রিয় ‘জালাল মামা’?
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও জালাল উদ্দিনকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে না থাকলেও আড়াল থেকে যোগাযোগ ও প্রভাব বজায় রাখছেন। এমনকি দেশের ভেতরেই অবস্থান করে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন—এমন দাবিও রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নাশকতার পরিকল্পনায় অর্থায়ন ও নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে এই দাবির পক্ষে প্রকাশ্য নথি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে
একসময় প্রকাশ্য রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে থেকে প্রভাব বিস্তার করা একজন ব্যক্তি যদি বর্তমানে কোনো মামলার আসামি বা তদন্তাধীন ব্যক্তি হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, তার বিরুদ্ধে কী কী মামলা রয়েছে এবং মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী—এসব তথ্য স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে অতীতে তার বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ আদায়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া কিংবা অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগগুলোর কোনোটি সত্য হলে সেগুলোর নথিভিত্তিক তদন্তও প্রয়োজন।
কারণ স্থানীয়দের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে ‘জালাল মামা’ কেবল একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন না; বরং একটি রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে থেকেও সেই কাঠামোর সুবিধা নেওয়া একজন নেপথ্য প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।
আর যদি এসব অভিযোগের অনেকটাই রাজনৈতিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে ছড়ানো হয়ে থাকে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষের এখন মূল প্রশ্ন—‘জালাল মামা’ কি সত্যিই অতীতের ক্ষমতার অধ্যায়, নাকি আড়ালে থেকেই এখনো সেই পুরোনো প্রভাববলয় সক্রিয় রাখছেন ? উত্তরটি নির্ভর করছে নিরপেক্ষ তদন্ত, নথি ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর।








Discussion about this post