সিদ্ধিরগঞ্জে ‘ডেভিল হান্ট’ নিয়ে প্রশ্ন
মামলার আসামিদের অনেকে অধরা, নাশকতার আশঙ্কা
সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটলেও সিদ্ধিরগঞ্জে তৎকালীন প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের একটি অংশ এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামিদের কেউ কেউ আত্মগোপনে থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এলাকায় যোগাযোগ রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সিদ্ধিরগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল, বাজার, ঘাট, পরিবহন, বালু, ড্রেজার, তেল ও সাইলোসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ ছিল একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের অনেকগুলো নিয়ে মামলা, অভিযোগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হলেও সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, আদমজী ইপিজেড, পাওয়ার হাউজ, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজ, বাজার-হাট ও স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ, বালু ও ড্রেজার ব্যবসা, ডিপো, সাইলো, মাদক ব্যবসা এবং সরকারি-বেসরকারি জমি দখলকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিল। স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে এই নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়েছিল।
‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানে গ্রেপ্তার হলেও অনেকে অধরা
দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের প্রথম কয়েক দিনেই সারা দেশে কয়েক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হন এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশ করা হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জেও ওই অভিযানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়; পুলিশ তখন বলেছিল, গ্রেপ্তারদের মধ্যে কয়েকজন এজাহারভুক্ত এবং অন্যরা সন্দেহভাজন আসামি।
তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, আলোচিত কয়েকজন নেতা-কর্মী তখনো গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলছিলেন। তাদের মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন, নুরউদ্দিন মিয়া, আরিফুল হক হাসান, আবু বকর সিদ্দিক আবুল, যুবলীগ নেতা ফারুকসহ আরও কয়েকজনের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ডের সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কয়েকজনের বিরুদ্ধেও আন্দোলনকেন্দ্রিক সহিংসতা, নাশকতা, দখল, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি মামলার বর্তমান অবস্থা, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন এবং আদালতে মামলাগুলোর অগ্রগতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
মতির গ্রেপ্তার, বাকিদের নিয়ে প্রশ্ন
সিদ্ধিরগঞ্জের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও থানা যুবলীগের আহ্বায়ক মতিউর রহমান মতি ও তার ছেলে বাবুইকে ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ভাটারা থানা পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলাসহ বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে মতি দীর্ঘদিন সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করতেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা বিচারাধীন বিষয়।
মতির গ্রেপ্তারের পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়—তার সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িকভাবে ঘনিষ্ঠ হিসেবে যাদের নাম আলোচিত, তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা ও অভিযোগের তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?
ইপিজেড ঘিরে পুরোনো আধিপত্যের অভিযোগ
আদমজী ইপিজেডকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দার দাবি, ইপিজেডের বিভিন্ন লাভজনক কাজ, ঠিকাদারি, মালামাল পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব ছিল।
এমনকি ইপিজেড থেকে মালামাল চুরি করে বাইরে বের করে নেওয়া, কাস্টমস ফাঁকি এবং ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন, মামলা ও আদালতের নথি ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইপিজেডের পাশাপাশি ৪, ৬, ৭, ৮ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডসহ সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন খাতেও একই ধরনের প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল।
নতুন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পুরোনো নেটওয়ার্ক ?
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রভাবশালী থাকা কিছু ব্যক্তি বর্তমানে আত্মগোপনে থেকেও স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাদের কেউ কেউ বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোকে একতরফাভাবে সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন বা নতুন কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে পুরোনো অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেলে এলাকায় ফের চাঁদাবাজি, দখল, মাদক ব্যবসা ও সহিংসতা বাড়তে পারে। কেউ কেউ অতীতের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ভবিষ্যতে নাশকতার আশঙ্কার কথাও বলছেন। তবে নাশকতার কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা প্রস্তুতির বিষয়ে প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের সামনে বড় প্রশ্ন
সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দাদের প্রশ্ন—যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের ক্ষেত্রে অগ্রগতি কতটুকু? একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালালে তার বিরুদ্ধেও কি একইভাবে আইন প্রয়োগ করা হবে?
স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা মামলা, অভিযোগ, প্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় কাউকে হয়রানি না করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা—অতীতের যে কোনো রাজনৈতিক বা অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাবমুক্ত থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে কথিত নাশকতার আশঙ্কা থাকলে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে আগেই তা প্রতিরোধ করা হবে।
কারা এখনো আত্মগোপনে, কার বিরুদ্ধে কোন মামলায় অভিযোগ রয়েছে, কোন মামলার তদন্ত কোথায় এবং কারা রাজনৈতিক আশ্রয়ে এলাকায় সক্রিয়—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তরই এখন সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।









Discussion about this post