স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ অবনতি নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম মোক্তার আশরাফ উদ্দিনের চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্বল নেতৃত্ব ও অদূরদর্শিতার সুযোগে পুরো এলাকা কার্যত অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক মাসে বন্দর এলাকায় খুন, ছিনতাই, মাদক বাণিজ্য ও ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বলে স্থানীয়দের দাবি।
পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র ছিনতাই : নজিরবিহীন লজ্জা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি অস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা। গত মে মাসে চৌধুরী বাড়ি এলাকায় অভিযানে গিয়ে দুর্ধর্ষ ‘সিফাত বাহিনী’র হামলায় দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি শর্টগান ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—যে ওসি নিজের ফোর্সের নিরাপত্তা ও সরকারি অস্ত্র রক্ষা করতে ব্যর্থ, তিনি কীভাবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন ?
মাদক বাণিজ্যে ‘পুলিশের ছত্রচ্ছায়া’ অভিযোগ
“বন্দরে পুলিশের শেল্টারে ৫০টি মাদক স্পট” শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এমন ঘটনায় ইতোমধ্যে এসআই মনির হোসেন, এসআই শহিদুল ইসলাম ও এসআই ফারুককে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—এই অপেশাদারিত্ব ও অনিয়মের দায় কি শুধুই কয়েকজন উপপরিদর্শকের, নাকি এর দায়ভার ওসির নেতৃত্বকেও বহন করতে হবে ?
রক্তাক্ত বন্দর: একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্ক
বন্দরে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ড জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। মদনগঞ্জে ড্রেজার ব্যবসা ও মাদকবিরোধী অবস্থানের কারণে মাকসুদুর রহমান জুয়েলকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এছাড়া এনায়েতনগরের ভাঙা ব্রিজ এলাকায় একটি মোবাইল ফোন ছিনতাইকে কেন্দ্র করে ১৮ বছর বয়সী হোসিয়ারি শ্রমিক জোবায়েরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তার মৃত্যু হলে বিক্ষুব্ধ জনতা মরদেহ নিয়ে থানা ঘেরাও করে।
বন্দর থানার ওসি যেন নিজেই বিচারক :
প্রায় প্রতিদিন বন্দর থানা সহ আমার এলাকার প্রতিটি ফাঁড়িতে নানা অভিযোগ নিয়ে আসা বিচার প্রার্থীদের নিয়ে বিরোধীদের ডেকে থানা ও বাড়িতে বসে চলে বিচার কার্যক্রম। খোদ বন্দর থানার ওসির নির্দেশক্রমে অপহরণকারীদেরও টাকায় মুক্তি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গত ১৯ মে রাতে (মঙ্গলবার) রাতে প্রাডো গাড়ি দিয়ে পাঁচজনের এক অপহরণকারী দল এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে বন্দর থানার আন্তাল পারি এলাকায় এসে পুলিশের হাতে আটক হয়। এই ঘটনায় মামলা দায়ের না করে মঙ্গলবার এবং পরদিন দুপুর পর্যন্ত দফায় দফায় বৈঠক করে বন্দর থানা ওসি গোলাম মোক্তার আশরাফ উদ্দিনের পরামর্শ ক্রমে ওই অপহরণকারীদের কাছ থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে অপহরণকারী ৫ জনকে ছেড়ে দেয়ে কাম তাল ফাঁড়ির ইনচার্জ। ফের এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয় মুহূর্তের মধ্যে।
প্রতিরাতেই বন্দর থানায় বসে বিচার সালিশির কারবার। বন্দর থানা যেন এক আদালত প্রাঙ্গনে পরিণত হয়েছে।
শুধু বন্দর থানাই নয় নারায়ণগঞ্জের প্রায় প্রতিটি থানাতেই বিচার কার্যক্রম চালিয়ে অর্থ হাতে নেয়ার লোমহর্ষক চিত্র প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি বন্দর থানায় ধর্ষিতা নারী মামলার বিচার চাইতে অভিযোগ দায়ের করেন ফতুল্লা থানায়। এমন অভিযোগ গ্রহণ করে লম্পট সালাউদ্দিন কে তাৎক্ষণিক আটক করে এনে থানায় ১০ ঘণ্টা হাজতে রেখে ধর্ষণ মামলার বিচার সালিশি করে সালাউদ্দিন ও তার পরিবারের কাছ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়ে অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছেন খোদ ওসি মাহবুব। চাঞ্চলের সৃষ্টি হলেও পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন সকল কর্মকর্তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
যেন ভুতুড়ে কর্মকাণ্ড চলছে নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ থানায়।
মামলার বদলে ঘুষ: নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র
অভিযোগ রয়েছে, নিহত জোবায়েরের পরিবার মামলা করতে গেলে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদের কাছে ঘুষ দাবি করেন। পরে জনরোষের মুখে তাকে ক্লোজড করা হলেও, এ ঘটনা পুলিশের ভেতরের নৈতিক অবক্ষয়ের নগ্ন চিত্র হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়াও বন্দর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি রেস্তোরাঁয় প্রকাশ্যে লুটপাটের ঘটনাও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
ওসির ওপর আস্থা হারাচ্ছেন সবাই
বিশ্বস্ত সূত্র মতে, একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যও বর্তমান ওসির ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের মধ্যেও তার অপসারণের দাবি জোরালো হচ্ছে।
দাবি : অবিলম্বে অপসারণ ও দক্ষ নেতৃত্ব
বন্দরবাসীর দাবি, অবিলম্বে বর্তমান ওসিকে প্রত্যাহার করে একজন দক্ষ, সৎ ও সাহসী কর্মকর্তার হাতে থানার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হোক। অন্যথায় আইনশৃঙ্খলার এই ধস আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্দরবাসী এখন একটাই প্রশ্ন করছে—আর কত প্রাণ ঝরলে জাগবে প্রশাসন ?









Discussion about this post