সোনারগাঁয়ে স্কুলছাত্রীকে লাথি: অপরাধী নয়, শাস্তি ভুক্তভোগীর—টিসি দিয়ে বহিষ্কার, নীরব প্রশাসন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এক স্কুলছাত্রীকে প্রকাশ্যে লাথি মেরে উত্ত্যক্ত করার ন্যক্কারজনক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিস্ময়করভাবে, এই ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ভুক্তভোগী ছাত্রীকেই বিদ্যালয় থেকে টিসি দিয়ে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে—যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা নদীর ওয়াকওয়ে দিয়ে স্কুলড্রেস পরা দুই ছাত্রী হাঁটছিল। হঠাৎ পেছন থেকে এক কিশোর এসে তাদের একজনকে পরপর লাথি মারে। ছাত্রীটি প্রতিবাদ করলে তাকে আবারও লাথি মারা হয়। পুরো ঘটনাটি আরেকজন মোবাইল ফোনে ধারণ করে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
ভুক্তভোগী ছাত্রী সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুরের ওমর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা একজন পোশাক কারখানার শ্রমিক। অভিযুক্ত কিশোর, যার বয়স সাড়ে ১১ বছর, স্থানীয় রায়েরটেক এলাকার ভাড়াটিয়া পরিবারের সন্তান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি দীর্ঘদিন চাপা থাকলেও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তা সামনে আসে। এদিকে অভিযুক্ত কিশোরকে নিয়ে একটি তথাকথিত ‘সালিসি’ বৈঠকের ভিডিওও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে ‘মাফ চাওয়ানো’ হয়—যা আইনি বিচারের পরিবর্তে সামাজিক প্রহসন বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্কুল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘স্কুলের বাইরের ঘটনা’ উল্লেখ করে দায় এড়ালেও, শাস্তি হিসেবে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে টিসি দিয়ে বের করে দিয়েছে। একই ঘটনায় আরেক ছাত্রীকেও বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মেয়েকে লাথি মেরে অপমান করা হয়েছে, অথচ বিচার তো দূরের কথা—উল্টো আমার মেয়েকেই স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হলো। আমরা গরিব মানুষ, এখন অন্য স্কুলে ভর্তি করাতে হবে।”
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, “স্কুল কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই ছাত্রীকে টিসি দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি স্কুলের বাইরে ঘটায় স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে।”
এদিকে সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। তবে এখনো ভুক্তভোগীর পরিবার থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—একটি শিশুকে প্রকাশ্যে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও কেন প্রশাসন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে না? কেন অভিযুক্তকে আইনের আওতায় না এনে ‘সালিস’ নামের প্রহসনে দায় সেরে ফেলা হচ্ছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন অপরাধের শিকার এক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই বিতাড়িত করা হলো?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। এতে একদিকে যেমন অপরাধীরা উৎসাহ পায়, অন্যদিকে ভুক্তভোগীরা আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।









Discussion about this post