সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চালু ‘অটো ফাইন সিস্টেম’, কমেছে আইন লঙ্ঘন ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি; এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি নিষিদ্ধ থ্রি হুইলার
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন ভাঙার বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি।
মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থাপন করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত করা হচ্ছে অতিরিক্ত গতি, উল্টো পথে চলাচল, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, নির্ধারিত লেন না মানা ও অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন।
শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট যানবাহনের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা হচ্ছে।
‘অটো ফাইন সিস্টেম’ নামে পরিচিত এ প্রযুক্তি চালুর প্রথম দিনেই ৪২৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৯টি মামলা হয়েছে অতিরিক্ত গতির কারণে এবং ২৯টি উল্টো পথে চলাচলের জন্য।
তবে পরদিন সকাল ১১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত মামলার সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১৫টিতে। এতে মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরার পাশাপাশি চালক ও যাত্রীদের মধ্যেও স্বস্তি দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেইট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিতে এআই-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। মহাসড়কের উভয় পাশে ৪৯০টি পোলে স্থাপন করা হয়েছে ১ হাজার ৪২৭টি বুলেট ক্যামেরা।
এর পাশাপাশি রয়েছে পিটিজেড ড্রোন ক্যামেরা ও লং-ভিশন ক্যামেরা।
এসব ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিকভাবে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কোনো গাড়ি নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করলে, উল্টো পথে চললে কিংবা অবৈধভাবে পার্কিং করলে তা প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত হচ্ছে। পরে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের মোবাইল নম্বরে পাঠানো হচ্ছে মামলা সংক্রান্ত বার্তা।
প্রযুক্তিনির্ভর এ নজরদারির প্রভাব ইতোমধ্যে মহাসড়কের যান চলাচলে দৃশ্যমান হয়েছে বলে জানিয়েছেন চালক ও যাত্রীরা। তাদের ভাষ্য, আগে অনেক চালক সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং কিংবা উল্টো পথে চলাচল করলেও এখন ক্যামেরার ভয়ে এসব প্রবণতা কমেছে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমছে।
তবে প্রযুক্তির নজরদারি বাড়লেও মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি হুইলারের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে উল্টো পথে থ্রি হুইলার ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।
চালকদের কেউ কেউ স্বীকার করেছেন, উল্টো পথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সার্ভিস লেনের সীমাবদ্ধতা এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে দীর্ঘ পথ ঘুরে আসার বিড়ম্বনার কারণে তারা এভাবে চলাচল করেন।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামীম বলেন, এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছেন। মহাসড়কে দুর্ঘটনাও কমেছে। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ৪২৮টি মামলা হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ফলে ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে মহাসড়কে থ্রি হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ এবং এসব যান মহাসড়কে উঠলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদও স্পষ্ট করে বলেছেন, থ্রি হুইলারগুলো বাজার, ফিলিং স্টেশন ও পিডার রোডে চলাচল করতে পারবে; কোনো অবস্থাতেই মহাসড়কে উঠতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়কে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে শুধু মামলা ও জরিমানা নয়, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, নিষিদ্ধ যানবাহনের প্রবেশ এবং মহাসড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল—এসব বিষয়েও সমন্বিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
এআই ক্যামেরার কারণে এখন মহাসড়কে ট্রাফিক আইন ভাঙা আগের মতো সহজ নয়। চালকের চোখে ক্যামেরা না পড়লেও ক্যামেরার চোখ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে গেছে।
ফলে প্রযুক্তির নজরদারি যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিষিদ্ধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।









Discussion about this post