উচ্ছেদ করলেই ফিরে আসে দখলদাররা—অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পরও রাতে জ্বলে দোকানের বাতি
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
কোন অবস্থাতেই যেন নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক ও বিবি রোডের ফুটপাত ছাড়তে রাজি নয় হকাররা। একের পর এক উচ্ছেদ অভিযান, মামলা, ধস্তাধস্তি, হামলা, প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা—কোনোটিই দখলদার হকারদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযানে ফুটপাত ফাঁকা হলেও সন্ধ্যা নামতেই আবার পুরনো চেহারায় ফিরে আসে শহর।
ফুটপাত দখল করে বসে দোকান, আর অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের কয়েক ঘণ্টা পরই সেই দোকানগুলোতে জ্বলে ওঠে আলো।
প্রশ্ন উঠেছে, কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে এতটা বেপরোয়া হকাররা ? উচ্ছেদের পর বারবার ফুটপাত দখলের সাহসই বা তারা কোথা থেকে পাচ্ছে ?
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরের হকারদের দাপটের কাছে যেন বারবার অসহায় হয়ে পড়েছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় হকারদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ওই সময় উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ও উচ্ছেদকারী দলের ওপর হামলার মতো ঘটনাও ঘটে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দৃশ্যপট বদলায়নি—বদলেছে শুধু অভিযোগের ভাষা ও আশ্রয়দাতাদের পরিচয়। আগে শ্রমিক লীগের ব্যানার ব্যবহার করা হকারদের একটি অংশ এখন শ্রমিকদলের নাম-পরিচয় ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কখনো এনসিপির নেতাদের নাম, কখনো বিএনপির নেতাদের ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ তুলে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
চার মাসে বারবার অভিযান, তবুও দখলমুক্ত নয় ফুটপাত
হকার পুনর্বাসনের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর ফল দেখা যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন হকারদের তালিকা তৈরি করেছে, পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে, দফায় দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে—কিন্তু দখলদারদের একটি বড় অংশ যেন কোনো সিদ্ধান্তই মানতে রাজি নয়।
চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল শহরের সড়ক ও ফুটপাত দখল করে থাকা হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদে অভিযান চালায় সিটি করপোরেশন। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারাও ওই অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানেই আবার ফুটপাত দখলে চলে যায়।
এরপর ৪ মে উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে হকারদের বিরুদ্ধে। এতে দুই কর্মচারীসহ অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার কথা জানানো হয়। পরদিন ৫ মে সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান বাদী হয়ে ১০ হকারের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
কিন্তু মামলা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ৮ জুন আবারও উচ্ছেদকারী দলের সঙ্গে হকারদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ উচ্ছেদ অভিযান, হামলা, মামলা—সবকিছুর পরও ফুটপাত দখলের পুরনো চক্র কার্যত বহাল রয়েছে।
উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টা পরই আবার দখল
সর্বশেষ ২৪ আগস্ট সোমবার বিকালে বিবি রোডে হকার উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই ফের ফুটপাত দখল করে বসে হকাররা।
অভিযোগের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জাকির সুপার মার্কেটের সামনে আবারও অভিযান চালানো হয়।
উচ্ছেদকারী দলের প্রধান সম্রাট হাসান সুজনের অভিযোগ, অভিযান চালাতে গেলে হকাররা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা পুলিশের উপস্থিতিতে উচ্ছেদকারী দলকে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে হয়।
অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন শুধু ফুটপাত দখলের নয়—প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার পরও কেন দখলদাররাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকছে ?
গত চার মাসে উচ্ছেদকারী দলের ওপর একাধিক হামলা ও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও অদ্যাবধি হামলার ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারার অভিযোগও রয়েছে। এতে উচ্ছেদবিরোধী হকারদের মধ্যে আইনকে তোয়াক্কা না করার প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দিনে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, রাতে দোকানে জ্বলে আলো
ফুটপাত দখলের পাশাপাশি এবার সামনে এসেছে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হকারদের দোকানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের ছবি ছড়িয়ে পড়লে রোববার দুপুরে বিবি রোডে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও ডিপিডিসি যৌথ অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সন্ধ্যার পরই আবার হকারদের দোকান বসে যায়। শুধু দোকান বসাই নয়, সেখানে বিদ্যুতের আলোও জ্বলতে দেখা যায়।
এ ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—দিনের আলোয় যে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, রাত নামতেই সেই দোকানে বিদ্যুৎ আসে কীভাবে ? কে বা কারা আবার সংযোগ দিচ্ছে ? নাকি প্রকাশ্যেই চলছে অবৈধ বিদ্যুতের এই কারবার ?
নগরবাসীর অভিযোগ, ফুটপাত দখল ও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ—দুই ক্ষেত্রেই অভিযান হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ফলে প্রশাসনের অভিযান শেষ হলেই দখলদারদের ফিরে আসা যেন এখন নিয়মিত নাটকের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বদলেছে ব্যানার, বদলায়নি দখলের চিত্র
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে শামীম ওসমানের নির্দেশে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান করেছিল ফুটপাত দখলকারী হকারদের একটি অংশ। এ ঘটনায় হকার শ্রমিকলীগের নেতা রহিম মুন্সি ও আসাদসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তারা পলাতক থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দোকান ও দখল বহাল থাকার অভিযোগ উঠেছে। বরং তাদের জায়গা দখলে নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয়তাবাদী হকার দলের সভাপতি মিজানুর রহমান রনিসহ কয়েকজন। এদের নেপথ্যে মহানগর বিএনপির এক শীর্ষ নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান যাই হোক, নগরবাসীর প্রশ্ন একটাই—ক্ষমতার পালাবদল হলেই কি শুধু ফুটপাত দখলের নিয়ন্ত্রক বদলাবে, নাকি সাধারণ মানুষের হাঁটার অধিকারও একদিন ফিরবে ?
ফুটপাত কার—হকারদের, নাকি পথচারীদের ?
নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এসব সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। কিন্তু ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে থাকায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে হাঁটতে হয়। এতে একদিকে বাড়ছে যানজট, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
নগরবাসীর ক্ষোভ, ফুটপাত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পত্তি নয়। এটি পথচারীদের চলাচলের জায়গা। অথচ বছরের পর বছর ধরে দখলদারদের কাছে সেই অধিকার জিম্মি হয়ে আছে।
বারবার উচ্ছেদের পরও হকারদের ফিরে আসা, সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ, মামলা করেও কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়া এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পরও দোকানে আলো জ্বলার ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে—
তাহলে কি সত্যিই কোন অবস্থাতেই ফুটপাত ছাড়বে না হকাররা ?
এখন দেখার বিষয়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবারও আগের মতো কয়েক ঘণ্টার উচ্ছেদ অভিযানেই দায়িত্ব শেষ করে, নাকি দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে নগরবাসীর ফুটপাত সত্যিকার অর্থেই পথচারীদের কাছে ফিরিয়ে দেয়।









Discussion about this post