নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন জটিলতা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির মধ্যে এবার নিজের নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন তুললেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। তার ভাষায়, জনপ্রতিনিধিরাই যদি নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বলেন, “আমরা জনপ্রতিনিধি, আমাদেরই নিরাপত্তা নেই। তাহলে আমাদের যারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কিভাবে?”
তিনি বলেন, “আমরা তো সরকার দল। চাইলেও সব বলতে পারি না। কিন্তু বাস্তবতাও তো আমাদের দেখতে হয়। আমাদের দায়িত্ব জনগণকে রক্ষা করা। আমরা সরকারের অংশ হওয়ায় সব কথা বলতে পারি না। তবে এই সমস্যাগুলোর সমাধান হওয়া দরকার।”
জনপ্রতিনিধির এমন বক্তব্য নারায়ণগঞ্জের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বন্দর এলাকায় আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘সিফাত বাহিনী’র বিরুদ্ধে হত্যা ও সন্ত্রাসের অভিযোগের ঘটনাগুলো জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গত ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদ হাসান বুলবুলকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশ ‘সিফাত বাহিনী’র প্রধান শেখ সিফাতসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনার পর ব্যাপক বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধও হয়। পরবর্তীতে আদালত সিফাতসহ সাত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৩১ আগস্টও এ মামলার তদন্তে সিফাত বাহিনীর আরও তিন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের প্রশংসা করে আবুল কালাম বলেন, বন্দর এলাকায় ঘটনার পর পুলিশ যেভাবে সিফাত বাহিনীর সদস্যদের ধরতে অভিযান চালিয়েছে, তার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, রাত দেড়টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, শুধু বড় কোনো ঘটনার পর অভিযান চালালেই কি দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? স্থানীয়দের প্রত্যাশা—কিশোর গ্যাং, মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঘটনার পর নয়, বরং আগাম গোয়েন্দা নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযান জোরদার করা হোক।
জিয়া হল ও হকার ইস্যুতে পুরোনো সংকট
মতবিনিময় সভায় শহরের জিয়া হল এলাকা এবং হকার উচ্ছেদের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে বলে জানান সংসদ সদস্য। নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত দখল ও হকার পুনর্বাসন দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যা। একদিকে পথচারীদের চলাচল, যানজট ও নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন; অন্যদিকে জীবিকার স্বার্থে হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি সামনে আসে।
চলতি আগস্টে হকারদের পুনর্বাসনের জন্য রেললাইনের পাশের একটি জমি প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। তবে জমিটির মালিকানা ও ব্যবহারের প্রশ্নে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানালে সেই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এ নিয়ে সিটি করপোরেশন ও রেলওয়ের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধের ঘটনাও ঘটে।
অন্যদিকে উচ্ছেদ অভিযান চললেও হকাররা বারবার ফুটপাতে ফিরে আসছেন। ২৬ আগস্টও সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকারী দলের সঙ্গে হকারদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে এবং উচ্ছেদের পর আবার ফুটপাত দখলের অভিযোগ উঠে। এর আগে এপ্রিলেও জিয়া হলের সামনেসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়েছিল।
ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—উচ্ছেদই কি একমাত্র সমাধান, নাকি টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়? সংশ্লিষ্টদের মতে, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত সিদ্ধান্ত ছাড়া বঙ্গবন্ধু সড়ককে দীর্ঘমেয়াদে দখলমুক্ত রাখা কঠিন হবে।
‘সুবিধাভোগী’ ও প্রশাসনিক ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ
সভা শেষে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিগত সরকারের একটি অংশ এখনও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে এবং যোগ্যতা বা কর্মদক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া কেউ কেউ দায়িত্বে রয়েছেন।
তার অভিযোগ, একটি প্রকল্প এক বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তার দৃশ্যমান কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। অথচ এলাকার মানুষ এ নিয়ে জনপ্রতিনিধির ওপর চাপ দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, “জনগণ আমাকে প্রেশার দিচ্ছে আমি কী করছি। আমাদের প্রশাসনে স্লো গোয়িং সেকশন আছে, তাদের হুঁশিয়ারি দেওয়া দরকার।”
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কোন প্রকল্পে কী ধরনের জটিলতায় অগ্রগতি থেমে আছে, কার দায়িত্বে বিলম্ব হচ্ছে এবং এর জন্য কারা দায়ী—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকগুলোতেও মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদারের বিষয় আলোচিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত অভিযান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যৌথ ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
‘সরকারে আছি, সব কথা বলতে পারি না’—বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন
সংসদ সদস্যের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো—সরকারের অংশ হওয়ার কারণে তিনি ‘সব কথা বলতে পারেন না’। এই বক্তব্য একদিকে দলীয় সরকারের প্রতি জনপ্রতিনিধির রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এলাকার বাস্তব সমস্যা তুলে ধরার সীমাবদ্ধতার প্রশ্নও সামনে আনে।
বিশ্লেষকদের মতে, জনগণের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কোনো দলীয় বিবেচনার বিষয় নয়। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। আর কোথাও ব্যর্থতা থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রকাশ্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য যেহেতু নিজেই তার এলাকার নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাই এখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সামনে বড় প্রশ্ন—এই উদ্বেগের প্রতিকার কীভাবে হবে?
নগরবাসীর প্রত্যাশা, সাময়িক অভিযান বা বৈঠকের বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কিশোর গ্যাং ও অপরাধ দমনে নিয়মিত গোয়েন্দা তৎপরতা, হকার সমস্যায় বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক।
কারণ জনপ্রতিনিধির কণ্ঠেই যখন নিরাপত্তাহীনতা ও প্রশাসনিক ধীরগতির অভিযোগ উঠে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—নারায়ণগঞ্জের সমস্যা সমাধানে এবার কি শুধু আলোচনা হবে, নাকি দেখা যাবে কার্যকর পদক্ষেপও?









Discussion about this post