এসপি মিজানুরের ছায়ায় ‘ক্যাশিয়ার’ করিম?
বদলির খবরেই কোটি টাকার অভিযোগ নিয়ে বিদায়, স্বস্তির নিঃশ্বাস ট্রাফিক পুলিশের ভেতরে
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মিজানুর রহমান মুন্সির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনের ভেতরে অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ার নানা অভিযোগ ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সময় বিভিন্ন অপরাধ ও অর্থনৈতিক খাত নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠা কথিত সিন্ডিকেটের কয়েকজন ‘ক্যাশিয়ার’ সক্রিয় ছিলেন। সেই তালিকায় পরিবহন সেক্টরের অন্যতম প্রভাবশালী নাম হিসেবে উঠে এসেছে ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) আব্দুল করিমের নাম।
অভিযোগ আরও গুরুতর—পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সির বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই কথিত এই সিন্ডিকেটের ভেতরে তৎপরতা বেড়ে যায়। আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ থেকে বিদায় নেন ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর আব্দুল করিম।
বিদায়ের আগে পরিবহন খাত, অবৈধ স্ট্যান্ড, সিএনজি, লেগুনা, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহন থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাসোহারা ও চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ পরিবহন সেক্টরের সকল কাউন্টারে কাউন্টারে ব্যাপর ভাবে চাউর হচ্ছে।
‘এসপির নাম ভাঙিয়ে’ চলত মাসোহারা ?
ট্রাফিক পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য, ইন্সপেক্টর আব্দুল করিম ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও কৌশলী।
তাঁদের অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহসও অনেকের ছিল না। কারণ, তাঁর পেছনে তৎকালীন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সির প্রভাব রয়েছে—এমন ধারণা সংশ্লিষ্ট মহলে প্রচলিত ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রভাবের কথা ব্যবহার করেই পরিবহন সেক্টরে একটি শক্তিশালী অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়।
চাষাড়া চত্বরেই প্রায় আটটি অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। এসব স্ট্যান্ড থেকে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় করা হতো বলে পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
শুধু তাই নয়, দূর পাল্লার পরিবহন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বিভিন্ন পরিবহন, বন্ধন, উৎসব ও বন্ধু পরিবহনসহ একাধিক যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে আব্দুল করিম তথা ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে । একইভাবে বিভিন্ন লেগুনা, সিএনজি এবং অন্যান্য যানবাহন থেকেও মাসিক ভিত্তিতে অর্থ সংগ্রহ করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইট বালুবাহী ট্রাকসহ রাতের বেলায় চলাচলরত সকল ট্রাক কনটেইনার থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজির নগর জুড়ে।
আর এসব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে তৎকালীন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সির নাম ও প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো কি না—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাষাড়া: যানজটের কেন্দ্র, নাকি ‘আয়ের কেন্দ্র’?
নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজটের কথা উঠলেই প্রথম সারিতে আসে চাষাড়া। বছরের পর বছর এ এলাকায় অবৈধ পার্কিং, সিএনজি ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড, বাস কাউন্টার, ভ্যান-রিকশার দখল এবং অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলের অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের সভায়ও চাষাড়ার অবৈধ পার্কিং বন্ধ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যে অবৈধ স্ট্যান্ড বছরের পর বছর টিকে থাকে, তা কি শুধু চালক-মালিকদের শক্তিতে?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চাষাড়ার অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। আর এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের কেউ কেউ যদি সেই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হয়ে থাকেন, তাহলে উচ্ছেদ অভিযান কাগজে-কলমে সফল হলেও বাস্তবে তা কতদিন টিকবে ?
এ কারণেই নগরবাসীর প্রশ্ন—চাষাড়ার যানজট কি কেবল রাস্তার সংকীর্ণতা ও অতিরিক্ত যানবাহনের ফল, নাকি যানজটকে টিকিয়ে রাখার পেছনে রয়েছে একটি অর্থনৈতিক স্বার্থের চক্র ?
যানজট নিরসনের দায়িত্ব, কিন্তু অভিযোগ ‘সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের’
আব্দুল করিমের দায়িত্ব ছিল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক দিক দেখভাল করা। বিভিন্ন সময় নগরের যানজট, অটোরিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি গণমাধ্যমেও বক্তব্য দিয়েছেন।
কিন্তু অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—যাঁর দায়িত্ব যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা, তাঁর প্রভাবাধীন এলাকায় বছরের পর বছর অবৈধ স্ট্যান্ড কীভাবে টিকে থাকল ?
কেন উচ্ছেদের পর আবারও একই জায়গায় যানবাহনের সারি তৈরি হতো ?
কেন নগরবাসী প্রতিদিন যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি ?
আর কেন পরিবহন সেক্টরের বিভিন্ন অংশ থেকে কথিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ বারবার উঠলেও কার্যকর তদন্তের কোনো দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি ?
সমালোচকদের ভাষায়, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আব্দুল করিমের দায়িত্বকাল এবং তৎকালীন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সির প্রশাসনিক ভূমিকা একসঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের তালিকায় সিএনজি থেকে ট্রাক
অভিযোগ রয়েছে, কথিত অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্কটি ছিল বহুমুখী। বিভিন্ন সিএনজি স্ট্যান্ড, ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জমুখী সিএনজি, বন্ধন, উৎসব, বন্ধু, আনন্দসহ বিভিন্ন পরিবহন, দূরপাল্লার বাস কাউন্টার, ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার এবং ইট-বালুবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই অর্থ কোথায় যেত ?
কারা সংগ্রহ করত ?
কারা হিসাব রাখত ?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কেউ কি এই অর্থের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার নামে আদায় করত ?
এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। তবে অভিযোগের ব্যাপ্তি এতটাই বড় যে শুধু কোনো একজন নিম্নপদস্থ সদস্যকে দায়ী করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসপি মিজানের বদলির খবর, তারপরই দ্রুত বিদায়
গত ৫ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ থেকে আব্দুল করিমের বিদায়ের পর ট্রাফিক বিভাগের ভেতরে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি করেছেন।
তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী বলয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব বিস্তার করছিল। সেই বলয় থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাবেন—এমন প্রত্যাশা করছেন অনেকে।
তবে এখানেই শেষ নয়।
আব্দুল করিম নারায়ণগঞ্জ ছাড়ার পর তাঁর পক্ষে একটি দালালচক্র মাঠে নেমেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে ‘সৎ’, ‘দক্ষ’ ও ‘জনবান্ধব কর্মকর্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে তাঁর পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
প্রশ্ন উঠেছে, বিদায়ের পরও এই প্রচারণার প্রয়োজন কেন ?
কোন অভিযোগ চাপা দিতে এত তৎপরতা ?
তদন্তের আওতায় আসুক মিজানুর রহমান মুন্সির পুরো সময়কাল
নগরবাসী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু আব্দুল করিমকে কেন্দ্র করে তদন্ত করলে পুরো চিত্র বেরিয়ে আসবে না। তৎকালীন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সির দায়িত্বকালকে কেন্দ্র করে পরিবহন, মাদক, অপরাধ ও অন্যান্য অভিযোগের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও খতিয়ে দেখতে হবে।
বিশেষ করে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন—
- মিজানুর রহমান মুন্সির দায়িত্বকালে নারায়ণগঞ্জে কারা কারা প্রভাবশালী ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন;
- পরিবহন খাতের কোন কোন স্ট্যান্ড ও রুট থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে;
- ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের দায়িত্বকাল ও পোস্টিংয়ের সঙ্গে এসব অভিযোগের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না;
- কথিত মাসোহারা আদায়ের অর্থের লেনদেনের কোনো ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা অন্য আর্থিক রেকর্ড পাওয়া যায় কি না;
- আব্দুল করিমের দায়িত্বকালে অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদের অভিযান কেন স্থায়ী হয়নি;
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এসপি মিজানুর রহমান মুন্সির নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি রয়েছে কি না।
প্রশ্ন এখন তদন্ত করবেই বা কে ?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।
যদি অভিযোগ সত্য হয় এবং একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয়ের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর এই কর্মকাণ্ড চলে থাকে, তাহলে শুধু বিভাগীয় পর্যায়ের লোক দেখানো তদন্তে কি প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে ?
নাকি প্রয়োজন হবে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ?
তদন্তে পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রক, ট্রাফিক পুলিশের বর্তমান ও সাবেক সদস্য, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন এবং দায়িত্বকালীন সিদ্ধান্তগুলো যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন একটাই—চাষাড়ার অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো কার আশ্রয়ে বছরের পর বছর চলেছে ?
যানজট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপনা কেন বারবার ব্যর্থ হয়েছে ?
আর পরিবহন খাত থেকে মাসোহারা আদায়ের যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তার পেছনে কি শুধু একজন ইন্সপেক্টর, নাকি এর পেছনে ছিল আরও বড় কোনো প্রশাসনিক ছাতা?
মিজানুর রহমান মুন্সির সময়কার সেই পুরো অধ্যায় তদন্তের আওতায় না এলে নারায়ণগঞ্জের পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অন্ধকার দিকের প্রকৃত চিত্র হয়তো কখনোই সামনে আসবে না।
এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আব্দুল করিম, মিজানুর রহমান মুন্সি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংস্করণে সংযুক্ত করা হবে।
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি হলেও মিজানুর রহমানের শাসনামলে শাসনামলে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বক্তব্য চাওয়া হলেও কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।








Discussion about this post