মাদক-অস্ত্রের ছায়ায় অনিক: রাজনীতির মাঠে দৃশ্যমান, পুলিশের খাতায় পলাতক
আমলাপাড়ার ফতে-পুত্রের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ, ডিবির অভিযানে গাঁজা-অস্ত্র উদ্ধার
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়া। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক একটি ডিবি অভিযান এবং চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটে শুভ চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একই এলাকার কয়েকজনের নাম সামনে আসায় আবারও আলোচনায় এসেছে আমলাপাড়ার মাদক নেটওয়ার্ক।
এই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ২৫ বছর বয়সী অনিকের নাম।
পুলিশের নথি ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, অনিকের বিরুদ্ধে শুধু মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগই নয়, এখন চাষাঢ়ায় শুভ দাস হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগও তদন্তে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ডিবির অভিযানে ফাঁকা বাড়ি, মিলল গাঁজা ও অস্ত্র
গত ৩ সেপ্টেম্বর আমলাপাড়ায় অনিকের মা ফাতেমা বেগম ওরফে ফতের বাড়িতে অভিযান চালায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বাড়িতে অনিকসহ কয়েকজন মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
ডিবির উপস্থিতি টের পেয়ে অনিক ও তার সহযোগীরা বাড়ির দ্বিতীয় তলার ছাদ দিয়ে দেয়াল টপকে পালিয়ে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ১ হাজার ৫০০ গ্রাম গাঁজা, পাঁচটি দেশীয় অস্ত্র ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অনিক, তার মা ফতে ও সুজনসহ অন্যদের আসামি করে মামলা হয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, ফতে’র বিরুদ্ধে মাদকসহ ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। অনিকের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এরপরই শুভ হত্যার তদন্তে অনিকের নাম
ডিবির ওই অভিযানের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে চাষাঢ়া হকার্স মার্কেট এলাকায় শুভ চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৫ সেপ্টেম্বর রাত দেড়টার দিকে হকার্স মার্কেটের পেছনে গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাহত অবস্থায় শুভর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে মাদক ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানায়।
এরপর তদন্তে গ্রেপ্তার করা হয় আমলাপাড়ার সুমন ওরফে মাইগ্যা সুমন, সিয়াম আহমেদ সিজান ও সোহানকে। তাদের কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল ও তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে বলে ডিবি জানিয়েছে।
ডিবির দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অনিক ও সুমন শুভকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১০টি ইয়াবার বিনিময়ে শুভর সহযোগী সোহানকে দিয়ে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। পরে অনিক ও অহিদের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল শুভর ওপর হামলা চালায়।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, অনিক ও অহিদ শুভকে গুলি করেন এবং দলের অন্য সদস্যরা ছুরি দিয়ে হামলা চালায়—এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে। তবে হত্যায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।
মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্যদাতা সন্দেহেই কি টার্গেট ?
শুভ হত্যার পেছনে আরেকটি সম্ভাব্য কারণও সামনে এসেছে। কয়েকটি স্থানীয় প্রতিবেদনে পুলিশ ও সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, আমলাপাড়ায় ডিবির মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্যদাতা হিসেবে শুভকে সন্দেহ করা হয়েছিল।
এ কারণেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে—এমন তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত নয়।
এখানেই ৩ সেপ্টেম্বরের ডিবি অভিযান এবং ৫ সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—অভিযানের খবর ফাঁস হয়েছিল কি না, কারা ডিবির গতিবিধি সম্পর্কে অবগত ছিল এবং শুভকে কেন টার্গেট করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত সংস্থা।
রাজনীতির মাঠেও নিয়মিত উপস্থিতি
অনিককে ঘিরে আরেকটি প্রশ্ন তার রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, গত দুই বছরে বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও কর্মসূচিতে তাকে নিয়মিত দেখা গেছে। এমনকি শহরের হোসিয়ারি সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত কয়েকটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তার উপস্থিতি ছিল বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর সঙ্গে অনিকের একাধিক ছবি থাকার দাবিও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণা ও বিভিন্ন ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাকে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে কারও সঙ্গে ছবি থাকা বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার বিষয়টিকে অপরাধে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অনিককে কোনো বিএনপি নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক পদ দিয়েছেন বা তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কোনো নেতা সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন—এমন প্রমাণ প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি।
বরং বিএনপি নেতা আবু আল ইউসুফ খান টিপু সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্য বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জকে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করার কথা বলেছেন।
দুই বছর আগেও অনিককে নিয়ে অভিযোগ
অনিকের নাম অবশ্য এবারই প্রথম মাদক কারবারের অভিযোগে সামনে আসেনি। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমলাপাড়া এলাকার মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্থানীয়রা স্মারকলিপি ও বিক্ষোভ করেছিলেন। ওই সময় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল, তাদের তালিকায় অনিকের নামও ছিল।
অর্থাৎ স্থানীয় অভিযোগ, পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযান এবং চলমান হত্যা তদন্ত—তিনটি আলাদা সূত্রে অনিকের নাম সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা এই তরুণ কীভাবে শহরের রাজনৈতিক কর্মসূচির দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠলেন?
‘শেল্টার’ নিয়ে প্রশ্ন, উত্তর নেই
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়মিত উপস্থিতি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসার কারণে অনিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এখন শুভ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অনিকের নাম আসার পর সেই পুরোনো প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে—মাদক কারবারের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে যদি অনিকের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং শহরের মাদক কারবার, অস্ত্রের বিস্তার এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠবে।
বর্তমানে অনিক পলাতক। ডিবি জানিয়েছে, তাকে ও ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।








Discussion about this post