হাইকোর্টের নির্দেশে শুভর শেষ বিদায়
পাঁচ দিনের অপেক্ষার অবসান, মুসলিম রীতিতে দাফনের নির্দেশ উচ্চ আদালতের
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
অবশেষে পাঁচ দিনের অনিশ্চয়তার অবসান হলো। নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাসের (৩০) মরদেহ মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনের নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের বেঞ্চ এই আদেশ দেন
আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এ নির্দেশের মধ্য দিয়ে শুভর শেষকৃত্য নিয়ে চলা পারিবারিক বিরোধ ও আইনি জটিলতার অবসান ঘটল।
এর আগে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের পরস্পরবিরোধী দাবিতে পাঁচ দিন ধরে শুভর মরদেহ সংরক্ষিত ছিল নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় হিমায়িত মরদেহবাহী গাড়িতে ।
একদিকে বাবা হরি চন্দ্র দাস দাবি করেন, তার ছেলে জন্মসূত্রে হিন্দু এবং হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার দাহ সম্পন্ন করতে হবে। অন্যদিকে মা, ভাই ও স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের দাবি ছিল—শুভ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং মুসলিম রীতি অনুযায়ী তার মরদেহ দাফন করা উচিত।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নিহতের মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করাও সম্ভব হচ্ছিল না। পরে বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালতে।
আদালতে নিহতের স্ত্রী জ্যুথি তার দুই বছরের শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এবং শাশুড়ি আয়েশা বেগমের পক্ষ থেকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী শুভর মরদেহ দাফনের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে উচ্চ আদালত মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মরদেহ দাফনের নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুর রহমানের তথ্য অনুযায়ী, শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস ও মা আয়েশা বেগমের ২০০৩ সালে বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
এরপর শুভ, তার মা, এক ভাই ও এক বোন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শুভ হলফনামার মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘বিল্লাল’ নাম নেন। পরে মুসলিম রীতি অনুযায়ী কাবিনের মাধ্যমে বিয়ে করেন। তার স্ত্রীও মুসলিম এবং তাদের সন্তান রয়েছে।
শুভর ভাই ইবরাহিমের দাবি, তারা দুই ভাই একসঙ্গে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং সুন্নতে খাতনা করেন। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার রওজাতুস সালেহীন মাদ্রাসায়ও তারা পড়াশোনা করেন।
তবে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস ছেলের জন্মগত ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে রেখে হিন্দু রীতিতে দাহ করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। দুই পক্ষের দাবির কারণেই এতদিন আটকে ছিল শুভর শেষ বিদায়।
পাঁচ দিন হিমঘরে মরদেহ
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামহলের সামনের সড়কে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শুভর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর মরদেহটি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় লাশবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়। ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধের কারণে পাঁচ দিনেও শেষকৃত্য সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শুভ হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিনও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেটের বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীর মাধ্যমে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে নেওয়া হয়। পরে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাকে ঘিরে ফেলে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
শুভ হত্যার তদন্তের পাশাপাশি এতদিন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল—‘দাহ নাকি দাফন ?’—উচ্চ আদালতের নির্দেশে তারও অবসান হলো।
এখন আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মুসলিম ধর্মীয় রীতি মেনেই নিহত শুভ চন্দ্র দাসের মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাঁচ দিনের অপেক্ষা, পারিবারিক বিরোধ ও আইনি জটিলতার পর অবশেষে শেষ বিদায়ের পথে এগোচ্ছেন চাষাঢ়ায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার এই যুবক।









Discussion about this post