মামলার আসামি পিজা শামীম এখন টরন্টোতে
জুয়া, দখল ও সন্ত্রাসের অভিযোগ; ঢাকায় ‘প্রভাব’ ধরে রাখার অভিযোগ পুত্র জুবায়েরের বিরুদ্ধেও
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জ শহরের আলোচিত আলী হায়দার শামীম ওরফে ‘পিজা শামীম’। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে দাপট দেখানো, জুয়া পরিচালনা, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি কানাডার অন্টারিও প্রদেশের রাজধানী টরন্টোতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডিতে কানাডায় অবস্থানের বেশ কিছু ছবিও প্রকাশ করেছেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে কখনো প্রয়াত সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন এবং কখনো তার ছেলে আজমেরী ওসমানের নাম ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন পিজা শামীম। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জুয়ার আসর থেকে ‘পিজা শামীম’
স্থানীয়দের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ শহরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার ‘সিটি ক্লাব’ ছিল পিজা শামীমের অন্যতম প্রভাববলয়। সন্ধ্যার পর সেখানে নিয়মিত জুয়ার আসর বসত এবং সেটি পরিচালনায় তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তিনি ‘জুয়ারী শামীম’ নামেও পরিচিতি পান।
২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর রাতে কালীরবাজারের সিটি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ২১ জন জুয়ারিকে গ্রেপ্তার করেছিল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এর আগে ২০১৮ সালের ১০ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু সড়কের কালীরবাজার এলাকার আমান ভবনে একটি জুয়ার আসরে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই জুয়ার আসরের নিয়ন্ত্রণেও পিজা শামীমের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
ভূমি দখলের মামলায় প্রধান আসামি
পিজা শামীমের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো বন্দরের ফরাজিকান্দা এলাকায় ভূমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত গোলাগুলির ঘটনা।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত রাইসুল হকের ছেলে মাইনুল হক পারভেজদের মালিকানাধীন জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে পিজা শামীমের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেলে শতাধিক ব্যক্তি সেখানে যায়। এ সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে এবং কয়েকজন আহত হন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় তানভীর আহম্মেদ বাদী হয়ে বন্দর থানায় মামলা করেন। মামলায় আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজা শামীমকে প্রধান আসামি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মামলার নম্বর ৩৬।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে কয়েকজনের হাতে অস্ত্র ছিল। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত পারভেজের স্ত্রী আদিবা সুলতানা গণমাধ্যমের কাছে এ বিষয়ে বক্তব্যও দিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে মামলার প্রধান আসামি হয়েও পিজা শামীম দীর্ঘ সময় গ্রেপ্তার না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল বলে দাবি তাদের।
সহযোগীদের নিয়েও নানা অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, পিজা শামীমের হয়ে ভূমি দখল, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন ধরনের ‘কন্ট্রাক্ট’ কার্যক্রমে মুকিত, মনির হোসেন ও আমীর নামে কয়েকজন ব্যক্তি সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখলসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তদের বক্তব্যও প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
দেশ ছাড়লেন কীভাবে, প্রশ্ন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পিজা শামীম কিছুদিন নারায়ণগঞ্জে প্রকাশ্যে ছিলেন না বলে স্থানীয়রা জানান। পরে তিনি আবার নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর ও কালীরবাজার এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা শুরু করেন।
সম্প্রতি তিনি কানাডায় চলে গেছেন। বর্তমানে টরন্টোতে অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করছেন। একাধিক মামলার আসামি হওয়ার পরও কীভাবে তিনি দেশত্যাগ করলেন এবং বিমানবন্দরে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত বাধা ছিল কি না—তা নিয়ে স্থানীয় মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে তার দেশত্যাগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুত্র জুবায়েরকে ঘিরেও অভিযোগ
পিজা শামীমের ছেলে জুবায়ের বিন হায়দার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) হিসেবে নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং পরবর্তী সময়ে সরকারি কাজ ও ঠিকাদারি কার্যক্রম ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল দাবি করছে।
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এসব অভিযোগের পর তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৯, ঢাকায় বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বদলির পরও নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কাজে তার প্রভাব রয়েছে এবং ঢাকায় বসে আগের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরকারি কাজ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।
তবে জুবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
পাসপোর্ট অফিসের আগুনের ঘটনাও আলোচনায়
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বিতরণের অপেক্ষায় থাকা প্রায় আট হাজার পাসপোর্ট পুড়ে যায় এবং অফিস ভবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
তবে পাসপোর্ট অফিসের ওই অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে পিজা শামীম বা তার পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই। তাই এ ঘটনাকে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ নেই।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে যারা অপরাধ ও অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে থেকেছেন, তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তিনি কীভাবে দেশত্যাগের সুযোগ পেলেন, তার কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আদালতের নির্দেশ ছিল কি না—সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
পিজা শামীম বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করলেও নারায়ণগঞ্জে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলাগুলোর আইনগত নিষ্পত্তিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।









Discussion about this post