ত্বকী হত্যার ১৬২ মাস: বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ, দ্রুত অভিযোগপত্র ও বিচার দাবি
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার সাড়ে ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন তাঁর বাবা রফিউর রাব্বি। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ১৬২ মাস উপলক্ষে আয়োজিত মোমশিখা প্রজ্বালন কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন। ত্বকী হত্যার পর থেকে প্রতি মাসের ৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট ধারাবাহিকভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে।
রফিউর রাব্বি বলেন, “সাড়ে ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো ত্বকী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র তৈরি হয়নি। আমরা জানতে চাই, এই বিলম্বের কারণ কী ? এখনো কি ঘাতকদের রক্ষার চেষ্টা হচ্ছে ?”
তিনি আরও বলেন, আগের সরকারের আমলে বিচারহীনতা ও দুর্বৃত্তদের রক্ষার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার কোনো ধারাবাহিকতা বর্তমান সময়েও আছে কি না—সেটি নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, ত্বকী হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থা র্যাবের পক্ষ থেকে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হলেও দীর্ঘদিনেও মামলার বিচার শুরু হয়নি। তাঁর অভিযোগ, চিহ্নিত হওয়ার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা গেছে এবং অতীতে প্রশাসনের কাছ থেকে তারা নিরাপত্তা পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা ত্বকী হত্যার পাশাপাশি সাগর-রুনি, তনুসহ দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন বা বিচারপ্রক্রিয়ায় স্থবির হয়ে থাকা হত্যাকাণ্ডগুলোর দ্রুত বিচার দাবি করেন। তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থর সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক দীনা তাজরিন, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব হালিম আজাদ, দৈনিক খবরের পাতার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা জিয়াউল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক, সিপিবির সাবেক জেলা সভাপতি হাফিজুর রহমান, ন্যাপের জেলা সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি মাহমুদ হোসেন, গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অঞ্জন দাস, বাসদের জেলা সদস্য প্রদীপ সরকার, চেম্বার অব কমার্সের সদস্য আহমেদুর রহমান, আবৃত্তিশিল্পী ফাহমিদা আজাদ ও সামাজিক সংগঠন সমমনার সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ্র সাহা।
যেভাবে হত্যা করা হয় ত্বকীকে
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাব এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করে, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। ওই সময় র্যাবের পক্ষ থেকে শিগগিরই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিলের কথা জানানো হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল হয়নি।
এদিকে ত্বকী হত্যার বিচার শুরু, অভিযোগপত্র দাখিল এবং চিহ্নিত আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট ও ত্বকী মঞ্চ। প্রতি মাসের ৮ তারিখের মোমশিখা প্রজ্বালন কর্মসূচিও সেই ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ।
আয়োজকদের বক্তব্য, একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকা শুধু নিহতের পরিবারের জন্য নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। তাই দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।









Discussion about this post