বন্দরে দেলোয়ার প্রধানের ‘প্রভাববলয়’
ওসমানঘনিষ্ঠতা থেকে বিএনপির ছায়ায়—পুরোনো প্রভাব ফিরিয়ে আনার অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির নেতা দেলোয়ার হোসেন প্রধানকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে পুরোনো নানা অভিযোগ।
স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী এই নেতার বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে তেল চুরি, চাঁদাবাজি, ভূমিদখল, মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের অনেকগুলোই স্থানীয়দের বক্তব্য ও রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় থাকলেও সব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ও শামীম
ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দেলোয়ার প্রধান বর্তমানে বিএনপির কয়েকজন নেতার ছত্রচ্ছায়ায় সক্রিয় হয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে। এতে আওয়ামী লীগ আমলে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের।
‘আমি কোনো পার্টি বুঝি না, ওসমান পরিবার বুঝি’
দেলোয়ার প্রধানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বন্দরের একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ঘিরে।
সেখানে তিনি নিজেকে ওসমান পরিবারের ‘সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর সেই বক্তব্যের ভিডিও বা পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড যাচাই করে প্রকাশ করা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় ধরে ওসমান পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন দেলোয়ার। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি কলাগাছিয়া ইউনিয়নে নিজের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন।
তেল চুরির সিন্ডিকেটের অভিযোগ
দেলোয়ার প্রধানকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি তেল চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে বন্দর ও আশপাশের তেল ডিপো এবং শীতলক্ষ্যা নদীপথে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে একটি চোরাই তেল বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল। ওই চক্রের সঙ্গে দেলোয়ারের সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল ডিপো থেকে তাঁর সরাসরি নেতৃত্বে তেল চুরির অভিযোগের পক্ষে আদালতের রায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে সেটিই হবে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ। ফলে অভিযোগগুলো যাচাই না করে সরাসরি সত্য হিসেবে প্রকাশ না করাই সাংবাদিকতার নীতিগত অবস্থান।
কুলি থেকে বিপুল সম্পদের মালিক ?
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, একসময় সাধারণ কুলি হিসেবে কাজ করা দেলোয়ার প্রধান তেল ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ নিয়ে এলাকায় নানা ধরনের কথা প্রচলিত থাকলেও ‘হাজার কোটি টাকার মালিক’—এমন দাবির স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া জরুরি।
তাঁর নামে থাকা জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানি, ঠিকাদারি ব্যবসা ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য অনুসন্ধান করলে এই অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব।
বিএনপি নেতা-কর্মীদের ‘ত্রাস’—এমন অভিযোগ
কলাগাছিয়া ইউনিয়নের স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে দেলোয়ার প্রধানের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী এলাকায় স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারেননি।
কেউ কেউ আত্মগোপনে ছিলেন, আবার অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন বলে তাঁদের দাবি।
তাঁদের প্রশ্ন—যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে যিনি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে অভিযুক্ত, তিনি কীভাবে এখন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন?
জুলাই আন্দোলনের মামলাতেও আসামি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোতেও দেলোয়ার প্রধানের নাম রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এমনকি মদনপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে মামলার এজাহার, চার্জশিট, আদালতের আদেশ ও তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করা জরুরি। স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন কারাগারে থাকার পর তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন।
জামিন পাওয়া অবশ্যই অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়া নয়; একইভাবে মামলা বা এজাহারে নাম থাকা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে আদালত ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত।
‘ওসমানের সৈনিক’ এখন কার ছায়ায় ?
রাজনৈতিক পালাবদলের পর দেলোয়ার প্রধানের ফের সক্রিয় হয়ে ওঠাই এখন স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে তিনি আবারও নিজের পুরোনো প্রভাববলয় সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালী একটি মহল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভূমিদখল, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারিদের আশ্রয়ের অভিযোগ
বন্দর এলাকায় দেলোয়ার প্রধানের বিরুদ্ধে ভূমিদখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মতো অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিভিন্ন খাতে তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে ভূমি অফিসের নথি, থানায় দায়ের হওয়া মামলা ও সাধারণ ডায়েরি, মাদকসংক্রান্ত মামলার তথ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং সরকারি টেন্ডারের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রশ্নের মুখে রাজনৈতিক পুনর্বাসন
দেলোয়ার প্রধানকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে কি পুরোনো ক্ষমতাবানদের পরিচয়ও বদলে যায় ?
যিনি একসময় প্রকাশ্যে নিজেকে ওসমান পরিবারের ‘সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি, যাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে, তিনিই যদি এখন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাঠে নামেন, তাহলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার আগে তাঁদের অতীত ভূমিকা, মামলার নথি, সম্পদের উৎস এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা উচিত।








Discussion about this post