ব্যবসায়ী নেতার আড়ালে ‘প্রভাবের বলয়’
ওসমান ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, চেম্বার নিয়ন্ত্রণ থেকে ছাত্র আন্দোলন মামলায় কাজল
স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী অঙ্গনে একসময় প্রভাবশালী নাম ছিল খালেদ হায়দার খান কাজল। দীর্ঘ সময় নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নেতৃত্বে থাকা এই ব্যবসায়ী নেতাকে ঘিরে এখন সামনে আসছে নানা প্রশ্ন—ব্যবসায়ী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, সরকারি জমি নিয়ে বিতর্ক এবং আওয়ামী লীগ আমলে প্রশাসন ও ব্যবসায়ী মহলে তার প্রভাবের অভিযোগ।
প্রকাশ্য বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনেও কাজলের সঙ্গে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদের সরকারি বাসভবনে শামীম ওসমানের সঙ্গে এক টেবিলে কাজলের উপস্থিতির খবর প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো।
আর ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় শামীম ওসমানের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া ব্যবসায়ী নেতাদের একজন ছিলেন কাজল। একটি প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জের অর্ধশত ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে শামীম ওসমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছিল এবং তিনি নগরীকে নিরাপদ করেছেন বলে মন্তব্য করা হয়েছিল।
চেম্বারই কি ছিল প্রভাবের মূল ঘাঁটি ?
২০২৩-২৫ মেয়াদের জন্য চেম্বারের সভাপতি ছিলেন কাজল। পরবর্তী সময়ে তিনি ও সহসভাপতি শাহাদাৎ হোসেন ভূঁইয়া পদত্যাগ করলে জরুরি সভায় তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয় এবং ব্যবসায়ী নেতা মাসুদুজ্জামানকে সভাপতি করা হয়। চেম্বারের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, কাজল ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন।
তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, চেম্বারের নেতৃত্বকে ব্যবহার করে অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের ওপরও প্রভাব বিস্তার করা হতো। স্থানীয় একটি প্রতিবেদনে কাজলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়।
সরকারি জমি নিয়ে বড় প্রশ্ন
কাজলকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকার রাজউকের জমি নিয়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে রাজউকের অধিগ্রহণকৃত একটি ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ জমি কাজলের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে তিনি জমিটি ১৪ কোটি টাকায় পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে বিক্রি করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জমিটির বরাদ্দ ও বিক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে তখন প্রশ্নও উঠেছিল।
অর্থাৎ কাজলের প্রভাবের অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যবসা ও সম্পদসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রকাশ্য বিতর্ক ছিল।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে কাজল নিজেকে অলিখিত এমপির প্রভাবের মতো বিশাল প্রভাব বিস্তার করতো ওসমানীয় ক্ষমতায়।
প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
কাজলের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ—ব্যবসায়ী সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে নিজের প্রভাববলয় শক্তিশালী করা। যদিও প্রশাসনের ওপর তার কথিত নিয়ন্ত্রণ বা আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে একই পরিসরে তার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।
এমনকি ২০১৯ সালে পুলিশ সুপারের সরকারি বাসভবনে শামীম ওসমানের সঙ্গে একই টেবিলে তার উপস্থিতির খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
জুলাই আন্দোলনেও বিতর্কিত ভূমিকা
কাজলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠে আসে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। ফতুল্লায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় শামীম ওসমানসহ আরও অনেকের সঙ্গে খালেদ হায়দার খান কাজলের নামও আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলা হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের আগস্টে শামীম ওসমান ও তার ঘনিষ্ঠদের নামে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেওয়ার প্রসঙ্গে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে কাজলকে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার নামে লাইসেন্স করা একটি এনপিবি পিস্তল তিনি জমা দিয়েছিলেন; লাইসেন্সটি ২০১৬ সালে নেওয়া হয়েছিল।
‘ছায়া নিয়ন্ত্রক’ নাকি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সুবিধাভোগী ?
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী অঙ্গনে কাজলের উত্থানকে তাই শুধু একজন ব্যবসায়ী নেতার উত্থান হিসেবে দেখছেন না অনেকে। সমালোচকদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছিল তার প্রভাববলয়।
বিশেষ করে শামীম ওসমানের সঙ্গে তার প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিতি এবং ব্যবসায়ী সংগঠনে দীর্ঘ নেতৃত্ব সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
তবে কাজল নিজে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী বলেছেন, কিংবা তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত বক্তব্য কী—তা পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।
পতনের পর কোথায় কাজল ?
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জের প্রকাশ্য রাজনীতি ও ব্যবসায়ী অঙ্গনে কাজলের দৃশ্যমানতা কমে যায়। চেম্বারের সভাপতির পদ থেকেও তিনি সরে দাঁড়ান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে আত্মগোপনে থাকার কথা বলা হলেও ঢাকার কলাবাগানে বসে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনে অর্থায়ন কিংবা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠকের যে অভিযোগ রয়েছে, তার স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ফলে এসব অভিযোগকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—একসময় নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে থাকা কাজলের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, ব্যবসায়ী সংগঠনে দীর্ঘ প্রভাব এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলায় তার নাম আসা তাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—কাজলের দীর্ঘদিনের প্রভাববলয়ের প্রকৃত পরিধি কতটা ছিল? ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে তার ভূমিকা কতটা নিয়মতান্ত্রিক ছিল? সরকারি জমি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব কী? আর ২০২৪ সালের আন্দোলন ঘিরে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর পরিণতিই বা কী ?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত, নথিপত্র এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায়। আর সেখানেই হয়তো বেরিয়ে আসবে—কাজল ছিলেন কেবল একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতা, নাকি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা আরও বড় কোনো প্রভাববলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।









Discussion about this post