প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, গুলি—তবুও অধরা রাসেল-জাহিদ
শত শত বখাটে-মাদকসেবী গ্রেপ্তার, ‘ভয়ংকর’ অস্ত্রধারীরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে ?
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
প্রকাশ্য সড়কে অস্ত্র বের করে গুলি ছোড়া, প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে হামলা, হত্যা মামলায় আসামি হওয়া—এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশ ও র্যাবের একাধিক অভিযানের পরও নারায়ণগঞ্জ নগরীর মাসদাইর এলাকার আলোচিত দুই অস্ত্রধারী রাসেল ও জাহিদ এখনো অধরা।
অভিযোগের ভয়াবহতা এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার পরিমাণ বিবেচনায় প্রশ্ন উঠেছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে যখন শত শত মাদকসেবী, গাঁজাসেবী ও বখাটে যুবক গ্রেপ্তার হচ্ছে, তখন প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও গুলিবর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না কেন?
নগরজুড়ে এখন এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
থানার সামনে গুলি, তবুও পলাতক রাসেল
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই মাসের মাথায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বন্ধন পরিবহনের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ১০ জন।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে এক যুবক কোমর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে এস এম মালেহ রোডে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়েন। এরপর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার সামনেও পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়। পরে দুই পক্ষই ওই অস্ত্রধারীকে নিজেদের কর্মী নয় বলে দাবি করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে।
অভিযোগ রয়েছে, ভিডিওতে অস্ত্র হাতে দেখা ওই যুবকই মাসদাইর এলাকার রাসেল। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মামলার পর আত্মগোপনে চলে যান রাসেল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের তথ্যমতে, তিনি এখনো পলাতক।
প্রশ্ন হচ্ছে—একজন ব্যক্তি থানার সামনেই প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার পরও যদি বছরের পর বছর পুলিশের নাগালের বাইরে থাকেন, তাহলে অস্ত্রধারীদের কাছে পুলিশের সক্ষমতার বার্তা কী যাচ্ছে?
পলাতক আসামি, অথচ প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে!
রাসেলকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জায়গাটি তৈরি হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই। মামলার আসামি ও পলাতক থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রায় দেখা যায়।
এমনকি দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা নারায়ণগঞ্জে এলে দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে তাঁকে সেলফি তুলতেও দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন মামলার আসামি ও পলাতক ব্যক্তি কীভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন—সে প্রশ্ন তখনও উঠেছিল।
রাসেলের গ্রেপ্তার দাবি করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এনসিপি নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আহ্বায়ক শওকত আলী।
কিন্তু এরপরও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর গ্রেপ্তার অভিযান দৃশ্যমান হয়নি।
জাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তূপ
রাসেলের মতোই মাসদাইর এলাকার জাহিদকে নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। একাধিকবার প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মাসদাইরে ইমন নামে এক যুবক হত্যার ঘটনায় তাঁর মা জাহিদ ও তাঁর সহযোগীদের আসামি করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।
সেই মামলার জের ধরে গত মঙ্গলবার মাসদাইরের কাজিবাড়ী এলাকায় ইমনের বাবাকে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে জাহিদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ সময় জাহিদ নিজেও এক রাউন্ড গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ হত্যা মামলা, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন—জাহিদকে ঘিরে অভিযোগের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
র্যাবের অভিযানে গুলি—তারপরও অধরা!
২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর মাসদাইর বাজার এলাকায় কৃষক দলের এক নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি করার অভিযোগ ওঠে জাহিদের বিরুদ্ধে।
পরদিন তাঁকে গ্রেপ্তারে গাইবান্ধা বাজার এলাকায় অভিযান চালায় র্যাব-১১।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের সময় জাহিদ ও তাঁর সহযোগীরা র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করেও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন। মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল এলাকায় তাঁদের অনুসারীদের হামলায় র্যাবের কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
যদি এসব অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে বিষয়টি আর নিছক স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব থাকে না। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে, তিনি কীভাবে বারবার অভিযানের পরও পুলিশের নাগালের বাইরে থাকেন—এ প্রশ্নের জবাব এখন নারায়ণগঞ্জবাসী জানতে চায়।
নতুন এসপি, নতুন অভিযান—তবুও কেন অধরা?
নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সুপারদের আমলেও রাসেল ও জাহিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি নতুন পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদকসেবী, গাঁজাসেবী, বখাটে ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজন বহু যুবকের বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম জোরদার হয়েছে।
এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হলেও একই সঙ্গে প্রশ্নও উঠছে—ছোটখাটো অপরাধে দ্রুত গ্রেপ্তার সম্ভব হলে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, গুলিবর্ষণ, হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে সেই কঠোরতা কোথায়?
নগরবাসীর প্রশ্ন, রাসেল ও জাহিদের মতো আলোচিত অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে কি গোয়েন্দা দুর্বলতা রয়েছে, নাকি অন্য কোনো অদৃশ্য প্রভাব কাজ করছে?
‘অধরা’ থাকার সুযোগেই কি বাড়ছে সাহস?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, অস্ত্রধারী অপরাধীদের দীর্ঘদিন গ্রেপ্তার করা না গেলে তাদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে তাদের অনুসারীরাও আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের বাস্তবতাতেও সেই আশঙ্কাই যেন দৃশ্যমান। একের পর এক অভিযোগের পরও অভিযুক্তরা যদি প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারেন, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন কিংবা নতুন করে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে আলোচনায় আসেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ সত্য কি না, সেটি আদালতে প্রমাণের বিষয়। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত ও মামলার আসামিদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
তাই রাসেল ও জাহিদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
পুলিশের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা
নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে এখন বিষয়টি শুধু দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের প্রশ্ন নয়। এটি পুলিশের সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।
যে নগরীতে প্রকাশ্যে অস্ত্র বের করে গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে, থানার সামনে গুলির ঘটনা ঘটে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে—সেই নগরীতে অভিযুক্ত অস্ত্রধারীরা যদি বছরের পর বছর অধরা থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা পাবে কোথায়?
নতুন পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে অপরাধী ও বখাটেদের গ্রেপ্তার নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, রাসেল-জাহিদের মতো আলোচিত অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনতে পারলেই তার দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটবে।
এখন দেখার বিষয়—পুলিশ কি শুধু ছোট অপরাধীদের গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি প্রভাব-পরিচয়-আধিপত্যের ঊর্ধ্বে উঠে অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধেও একই কঠোরতা দেখাবে?
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা একটাই—অস্ত্র যার হাতেই থাকুক, তার পরিচয় নয়; অপরাধের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হোক, প্রমাণ মিললে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।








Discussion about this post