পাগলা-নয়ামাটিতে মাদক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
বিএনপি নেতা টিটুর স্বজনদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ, অস্বীকার অভিযুক্তদের
মহানগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানাধীন কুতুবপুর ইউনিয়নের পাগলা, নয়ামাটি ও আশপাশের এলাকায় মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এসব এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটুর ভাই স্বপন ও তপন, ভাতিজা মোল্লা রাজুসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুতুবপুরের কথিত মাদক বিক্রেতা আক্তার ওরফে ‘কিলার আক্তার’ এবং মিথুনের সরবরাহ করা মাদক ব্যবহার করে পাগলা-নয়ামাটি এলাকায় একটি চক্র মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালত বা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, পাগলা, নয়ামাটি, দেলপাড়া ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজে পাওয়া যায়। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তৎপরতা চালিয়ে আসছে।
টিটুর বিরুদ্ধে পূর্বের অভিযোগও আলোচনায়
স্থানীয় সূত্রগুলো শহিদুল ইসলাম টিটুর বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার পুরোনো অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, ২০০১ সালের পর বিএনপি সরকারের সময় টিটু ফেনসিডিল ও হেরোইন বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে এ অভিযোগের সমর্থনে নির্ভরযোগ্য নথি বা আদালতের কোনো রায় প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া কুতুবপুরের কথিত মাদক ব্যবসায়ী ‘কিলার আক্তার’-এর কাছ থেকে টিটু একটি গাড়ি, পরিবারের সদস্যদের জন্য স্বর্ণালংকার ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন উপহার পেয়েছেন—এমন অভিযোগ নিয়েও অতীতে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের কথা জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। প্রতি সপ্তাহে টিটুকে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভাই ও ভাতিজার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, টিটুর ভাই স্বপন পাগলা এসএম সুপার মার্কেটের একটি অফিসে বসে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করেন। পাগলা তালতলা এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে স্বপনের নামও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচিত বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, টিটুর ভাই তপন এবং ভাতিজা মোল্লা রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা স্থানীয় কয়েকজন মাদক বিক্রেতার কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে একটি মাদ্রাসা এলাকায় বসে বিক্রি করেন। নাককাটা বাড়ি এলাকার এক নারীর বাড়িতে মাদক ব্যবসা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রাজুর বিরুদ্ধে তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদকের হাতে কোনো মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অস্ত্রের অভিযোগও উঠেছে
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পাগলা নয়ামাটি এলাকায় অস্ত্রসহ এক ব্যক্তিকে আটকের একটি ঘটনাকে ঘিরেও নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ওই সময় দুইটি ৬ এমএম পিস্তল ও কয়েকটি ধারালো অস্ত্রসহ একজনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে কথিত মাদক ব্যবসায়ী আক্তার ও টিটুর ভাতিজা রাজু অস্ত্র দুটি নিয়ে যান।
তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন রাজু মোল্লা। তার দাবি, তিনি কোনো অস্ত্র নেননি। ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি শুনেছেন এবং ঘটনাস্থলে আক্তার গিয়েছিলেন বলেও শুনেছেন। অস্ত্র দুটি আসল নাকি খেলনা—এ নিয়েও এলাকায় ভিন্ন ধরনের আলোচনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি যে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাদক ব্যবসার প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে নিয়মিত অভিযান, মাদকবিরোধী তদন্ত এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগ অস্বীকার তপন ও রাজুর
অভিযোগের বিষয়ে তপন বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। তার পরিবারের কেউ মাদক বিক্রি তো দূরের কথা, মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত—এমন প্রমাণ দিতে পারলে আইন অনুযায়ী যে শাস্তি হবে তা তিনি মেনে নেবেন।
তপনের ভাষ্য, “আমার বড় ভাই শহিদুল ইসলাম টিটু থানা বিএনপির সভাপতি। আপনার কি মনে হয়, আমরা এ কাজ করতে পারি? একটি বিরোধী পক্ষ রয়েছে, তারা চায় না কেউ উপরে উঠুক। আমি, আমার ভাই এবং পরিবারের কেউ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই।”
রাজু মোল্লাও মাদক ব্যবসার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার পরিবারের কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত নয়। কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান রাজু।
অস্ত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজু বলেন, তিনিও বিষয়টি শুনেছেন, কিন্তু কোনো অস্ত্র নেননি। তার দাবি, ঘটনার সময় আক্তার সেখানে গিয়েছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। অস্ত্র দুটি আসল নাকি খেলনা, তা নিয়েও তিনি নিশ্চিত নন।
টিটুর দাবি—‘অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে ব্যবস্থা মেনে নেব’
অভিযোগের বিষয়ে শহিদুল ইসলাম টিটু বলেন, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছেন। তার দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি ৪৬টি মাদকবিরোধী প্রতিবাদ সভা করেছেন এবং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি সভাতেও মাদকের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন।
টিটু বলেন, “আমার পরিবারের কেউ যদি মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাদেরও ছাড় নেই। নির্বাচন এলে এসব অভিযোগ বেশি করে ওঠে। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, কেউ প্রমাণ দিতে পারবেন না।”
তিনি আরও বলেন, তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং বর্তমানে থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের সরেজমিনে এসে বিষয়টি দেখার আহ্বান জানান।
প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্তের
পাগলা-নয়ামাটি ও কুতুবপুরে মাদক ব্যবসা নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ নতুন নয় বলে একাধিক বাসিন্দা দাবি করলেও অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে মাদক সরবরাহ, বিক্রয়কেন্দ্র, অর্থ লেনদেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ থাকলে সেগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনবে।









Discussion about this post