তিতাস কার্যালয় ঘিরে গ্যাস চোর সিন্ডিকেটের অভিযোগ
অভিযান হয়, লাইন কাটে—কিন্তু মূল হোতারা অধরা ?
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ যেন কাটে না—কাটা হয় শুধু পাইপলাইন। এক এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, কিছু পাইপ-বার্নার জব্দ হয়, কখনো জরিমানাও করা হয়; কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা কথিত দালাল, সংযোগদাতা ও প্রভাবশালী মদদদাতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা কতটা হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
তিতাস গ্যাসের নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কার্যালয় ও বিপণন জোনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র অবৈধ গ্যাস-সংযোগের ব্যবসা চালিয়ে আসছে—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ভুক্তভোগীদের। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সদস্যরা আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে মিল-কারখানা পর্যন্ত অবৈধ সংযোগ দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে।
গত কয়েক বছরে তিতাসের একের পর এক অভিযানের খবরই যেন সেই অভিযোগের বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরেও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ ও বিচ্ছিন্ন করার অভিযান চালানো হয়।
২০২৬ সালেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এপ্রিল মাসে সিদ্ধিরগঞ্জের বাগানবাড়ি, উত্তর আজিবপুর ও ভূমিপল্লী এলাকায় অর্ধশতাধিক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এরপর মে মাসে সোনারগাঁয়ের নয়াপুর ও মিরেরটেক এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বিস্তৃত অবৈধ গ্যাসলাইন উচ্ছেদ করে ২ হাজার ১০০টি সংযোগ বিচ্ছিন্নের তথ্য প্রকাশিত হয়।
জুলাই মাসেও সোনারগাঁয়ে তিনটি চুন কারখানা ও একটি ঢালাই কারখানার অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তিতাস।
প্রশ্ন হচ্ছে—এত বিপুল অবৈধ সংযোগ এক দিনে তৈরি হয়নি। তাহলে বছরের পর বছর এসব লাইন বসাল কারা? কারা পাইপ সরবরাহ করেছে? কারা মাটি কেটে লাইন টেনেছে? কারা সংযোগের অনুমোদনহীন কারিগরি কাজ করেছে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই অবৈধ ব্যবসা থেকে সংগৃহীত অর্থের ভাগ কোথায় গেছে?
‘লাইন কাটলেই’ কি দায় শেষ?
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর কিছুদিনের মধ্যেই একই এলাকায় আবার সংযোগ চালু হওয়ার ঘটনাও ঘটে। কোথাও একই স্থাপনায় দ্বিতীয় দফা অভিযান চালানোর ঘটনাও সামনে এসেছে।
জুলাইয়ে বন্দরের হরিপুর এলাকায় একটি অবৈধ চুন কারখানায় দ্বিতীয় দফা অভিযান চালিয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষ শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্নই করেনি, চুলাও ভেঙে দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কারখানাটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
এদিকে আগস্টে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান নিজেই সোনারগাঁয়ে বিপুলসংখ্যক অবৈধ গ্যাসলাইনের অভিযোগ তুলে তিতাস কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি পুরো সোনারগাঁয়ে ৬৫ হাজার অবৈধ গ্যাসলাইনের দাবি করেন। এই সংখ্যাটি অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
পুরনো চক্র, নতুন ছত্রচ্ছায়া?
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক সরকার বদলালেও অবৈধ গ্যাস-সংযোগের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কথিত দালালচক্রের অনেকেই বহাল থাকে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে তারা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
তবে ‘আওয়ামী লীগ আমলের চক্র এখন বিএনপির নেতাদের ম্যানেজ করে ব্যবসা করছে’—এমন গুরুতর অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, লেনদেন, ফোনালাপ, ব্যাংক/মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল রেকর্ড, সাক্ষ্য বা সরকারি নথি ছাড়া কাউকে দায়ী করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
বরং অনুসন্ধানের আসল জায়গা হওয়া উচিত—একই অবৈধ সংযোগ বারবার কীভাবে তৈরি হয় এবং এর সঙ্গে কারা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত?
তদন্তের দাবি
নারায়ণগঞ্জে অবৈধ গ্যাস-সংযোগের প্রকৃত চিত্র বের করতে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
তিতাসের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোর গত কয়েক বছরের—
- অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের তালিকা,
- পুনঃসংযোগের অভিযোগ,
- জরিমানা ও মামলা,
- অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম,
- জব্দকৃত পাইপ ও সরঞ্জামের হিসাব,
- সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা,
- এবং একই এলাকায় বারবার অভিযান পরিচালনার তথ্য
পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগের নেপথ্যে থাকা দালাল, ঠিকাদার, কারিগরি সহায়তাকারী এবং অর্থের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনা দরকার।
দাবি একটাই—চক্রের মূল হোতারা গ্রেপ্তার হোক
অবৈধ গ্যাস-সংযোগ শুধু সরকারের রাজস্বের ক্ষতি করে না; এটি গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই এটি নিছক ‘লাইন কাটার’ অভিযান দিয়ে শেষ করার বিষয় নয়।
প্রতিবার অভিযান শেষে যদি শুধু কয়েকটি পাইপ কাটা হয়, কিছু চুলা ভাঙা হয় আর জরিমানা আদায় করেই অভিযান শেষ হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—চোরাই গ্যাসের বাজারের আসল কারবারিরা কোথায়?
নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি, অবৈধ গ্যাস-সংযোগের নেপথ্যে থাকা পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। প্রমাণ মিললে তিতাসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, দালাল, সংযোগদাতা, সুবিধাভোগী শিল্পমালিক এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
লাইন কাটা নয়—গ্যাস চুরির মূল শিকড় উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের দাবি।








Discussion about this post