লিবিয়ায় প্রবাসীকে অপহরণ করে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ
নারায়ণগঞ্জে গ্রেপ্তার ২, নারীর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি
নগর প্রতিনিধি :
লিবিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের দেখিয়ে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), নারায়ণগঞ্জ জেলা।
গ্রেপ্তাররা হলেন মামলার এজাহারভুক্ত এক নম্বর আসামি উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) এবং সাত নম্বর আসামি মর্জিনা বেগম (৩৯)। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তিন দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) তাদের আদালতে হাজির করা হলে মর্জিনা বেগম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার ইদ্রিস আলী (৫৪) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় বসবাস করছিলেন।
মামলার অভিযোগ ও পিবিআইয়ের তদন্ত সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ সন্ধ্যায় উত্তম সরকার ওরফে সুমনসহ কয়েকজন অস্ত্রধারী তিনটি গাড়িতে করে ইদ্রিস আলীর বাসার সামনে যায়। পরে অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে চোখ বেঁধে তাকে জোরপূর্বক তুলে অজ্ঞাত একটি স্থানে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। এ সময় তার পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপহরণের দুই দিন পর ইদ্রিস আলীকে মারধরের ভিডিও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের কাছে ইমোতে ভিডিও কলের মাধ্যমে দেখানো হয়। স্বামীকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে প্রথমে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে চক্রটি। স্বামীর জীবন বাঁচাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে একটি ব্যাংক হিসাবে ওই টাকা পাঠান ফাতেমা।
কিন্তু টাকা পাওয়ার পরও ইদ্রিস আলীকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় তাকে লোহার রড দিয়ে মারধর করা হয়। এতে তার ডান পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। বন্দি অবস্থায় তাকে দিনে মাত্র একটি প্যাকেট রুটি ও এক বোতল পানি দেওয়া হতো বলেও পিবিআই জানিয়েছে।
পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিকাশের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আরও অর্থ নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ইদ্রিস আলীর পরিবার ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দেয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রায় এক মাস ১৪ দিন আটকে রাখার পর ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল ত্রিপোলির মদিনা এলাকার একটি সড়কের পাশে ইদ্রিস আলীকে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। পরে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ২২ জুলাই ২০২৬ দেশে ফেরেন তিনি।
দেশে ফেরার পর সুস্থ হয়ে ইদ্রিস আলী গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোনারগাঁ থানায় মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪২, ৩২৩, ৩২৫, ৩৬৫, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩০৭, ১০৯ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় পরদিন, ১৬ সেপ্টেম্বর, নারায়ণগঞ্জ জেলা পিবিআই তদন্তভার গ্রহণ করে এবং এসআই মফিজুল ইসলামকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সাইনবোর্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে উত্তম সরকার ওরফে সুমন এবং মর্জিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ, বিপিএম জানান, প্রাথমিক তদন্তে চক্রটির লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করার তথ্য পাওয়া গেছে। অপহরণ, নির্যাতন এবং দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের কৌশলে চক্রটি কাজ করত বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তিন দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার দুই আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়। এ সময় মর্জিনা বেগম ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে মামলার অভিযোগ ও জবানবন্দির বিষয়গুলো আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
পিবিআই জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে আরও যারা জড়িত তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তিপণের টাকা কোন কোন ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা ব্যক্তির মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, চক্রটির লিবিয়া ও বাংলাদেশের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ কীভাবে হয়েছে এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।








Discussion about this post