সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে পালিয়ে ডেমরায় আত্মগোপন, ঢামেকের সামনে মীমের লাশ: গৃহকর্তাসহ তিনজন কারাগারে
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ে যে বাসায় প্রায় এক বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করত ১৫ বছরের মীম আক্তার, সেই বাসা থেকেই শুরু হয়েছিল তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের নির্মম পরিণতি।
ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মীমের মরদেহ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে এখন কারাগারে গৃহকর্তা, গৃহকর্ত্রী ও গৃহকর্ত্রীর বাবা।
আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
তারা হলেন—ফয়সাল আহমেদ (৩৫), তার স্ত্রী রাহেমা খাতুন রেশমা (২৯) এবং রেশমার বাবা এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক (৪৭)।
পুলিশের ভাষ্য, মীমের মরদেহ হাসপাতালের সামনে ফেলে রেখে আসামিরা অপরাধ আড়াল এবং গ্রেপ্তার এড়ানোর চেষ্টা করেন। ঘটনার পর তারা সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের বাসা ছেড়ে রাজধানীর ডেমরা এলাকায় আত্মগোপনে চলে যান। পরে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় ডেমরার বামৈল এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জের বাসা থেকেই রহস্যের শুরু
পুলিশ ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, মীম প্রায় এক বছর ধরে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় ফয়সালের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিল।
পরিবারের অভিযোগ, সেখানে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো।
নির্যাতনের কথা মীম তার পরিবারের সদস্যদের জানালে তাকে ওই বাসা থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার। কিন্তু পরিবারের সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।
গত ১২ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মীমের মরদেহ ফেলে রেখে যায় কে বা কারা।
স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই ঘটনায় ১৩ আগস্ট শাহবাগ থানায় প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছিল।
‘টাকা-পয়সা চুরি করে পালিয়েছে’—পরিবারকে ফোন
মামলার এজাহারে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।
মীমের মৃত্যুর পরদিন ১৩ আগস্ট ফয়সাল তার পরিবারের সদস্যদের ফোন করে দাবি করেন, মীম বাসা থেকে টাকা-পয়সা চুরি করে অন্য এক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয়। কারণ এর আগে মীম বাসায় নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানিয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা ১৭ আগস্ট ফয়সালের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় গেলে তাদের সেখানে যেতে না দিয়ে ‘তাড়িয়ে দেওয়া হয়’ বলেও মামলার বিবরণে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর ২০ আগস্ট মীমের পরিবার ঢাকায় গিয়ে শাহবাগ থানায় যোগাযোগ করে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে থাকা মরদেহ শনাক্ত করেন স্বজনরা।
রাতারাতি বাসা ছাড়ে পরিবার
ঘটনার পর সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের বাসা ছেড়ে আসামিদের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নিয়াজ মেহেদীর ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধ ঢাকার উদ্দেশ্যে মীমের মরদেহ হাসপাতালে ফেলে রেখে আসামিরা পালিয়ে যান। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে তারা সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের বাসা ছেড়ে রাতারাতি সপরিবারে অন্যত্র গা ঢাকা দেন।
এই পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাই তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করার পর ডেমরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানায়ও মামলা প্রক্রিয়াধীন
ঢাকার শাহবাগ থানায় মীমের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলেও ঘটনাটির সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সরাসরি যোগসূত্র থাকায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানাতেও নিয়মিত মামলার প্রক্রিয়া চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অর্থাৎ মীমের মৃত্যুর আগে সে যে পরিবেশে ছিল, সেখানে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষ করে—
- মীমকে আদৌ শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল কি না;
- নির্যাতনের ধরন কী ছিল;
- মৃত্যুর আগে তার শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল;
- কখন ও কোথায় তার মৃত্যু হয়েছে;
- কীভাবে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ঢামেক হাসপাতালে মরদেহ নেওয়া হয়;
- হাসপাতালে মরদেহ ফেলে যাওয়ার সময় কারা উপস্থিত ছিল;
- মীমের মৃত্যুকে আড়াল করতে কোনো পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না—
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
পরিবারকে ‘পালিয়ে যাওয়ার’ গল্প কেন ?
মীমের পরিবারের অভিযোগ ও মামলার বিবরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—মৃত্যুর পরদিন পরিবারকে ফোন করে তাকে ‘চুরি করে পালিয়ে গেছে’ বলে জানানো।
কিন্তু একই সময়ে ঢামেক হাসপাতালের সামনে একটি কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকা এবং পরে সেটি মীমের বলে শনাক্ত হওয়া ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তোলে।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে আসামিদের মরদেহ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। ফলে মীমের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে—এ প্রশ্নের পাশাপাশি মৃত্যুর পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসছে।
১৫ বছরের মীমের শেষ ঠিকানা এখন তদন্তের কেন্দ্রে
কুমিল্লার বাসুদেব বাজার এলাকার ফজলু মিয়ার মেয়ে মীম জীবিকার তাগিদে নারায়ণগঞ্জে গৃহকর্মীর কাজ করত। বয়স মাত্র ১৫ বছর। প্রায় এক বছর ধরে সে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের ওই বাসায় কাজ করছিল।
একদিকে পরিবারে ফেরার প্রস্তুতি, অন্যদিকে নির্যাতনের অভিযোগ—এর মধ্যেই ঢাকার হাসপাতালে তার নিথর দেহ।
এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সেই বাসাটি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখানে মীমের সঙ্গে কারা থাকত, প্রতিবেশীরা তার কান্না বা চিৎকার শুনেছেন কি না, মীমের ওপর নির্যাতনের কোনো আলামত ছিল কি না এবং ঘটনার দিন সে কখন বাসা থেকে বের হয়—এসব তথ্য বের করা গেলে মৃত্যুর রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উন্মোচিত হতে পারে।
)
মীমের মৃত্যুর ঘটনায় তিনজন গ্রেপ্তার হলেও ঘটনার পুরো রহস্য এখনও পরিষ্কার নয়। আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মীমের শেষ কয়েক ঘণ্টার গতিবিধি, সিদ্ধিরগঞ্জের বাসা থেকে ঢামেক পর্যন্ত মরদেহ নেওয়ার ঘটনা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।
একটি ১৫ বছরের কিশোরী কীভাবে গৃহকর্মী হিসেবে একটি পরিবারের কাছে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ঢামেকের জরুরি বিভাগের সামনে লাশ হয়ে পড়ে রইল—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন অপেক্ষার।
মীমের পরিবার হত্যার মামলা করেছে। ফলে তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা, দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং মীমের মৃত্যুর কারণ আদালতে প্রমাণের অপেক্ষায়।









Discussion about this post