দুঃসময়ের সহযোদ্ধা, সুসময়ের প্রতিপক্ষ ?
মান্নান-মামুন দ্বন্দ্বে বিভক্তির শঙ্কা নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
একসময় রাজপথে ছিলেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে মামলা-হামলা, রাজনৈতিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে একই মেরুতে ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ও বর্তমান নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের সেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে বেশ পরিচিত।
কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে দলটির তৃণমূল পর্যায় থেকে।
বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। বালুর ঘাট নিয়ে সংঘর্ষ, জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড পরিবর্তনের ঘটনা এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের বলয় পরিবর্তন—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, দুঃসময়ের রাজনৈতিক সহযাত্রীরা এখন কার্যত ভিন্ন বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের এই দূরত্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
দুঃসময়ের বন্ধুত্ব থেকে দূরত্বের শুরু
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ও আজহারুল ইসলাম মান্নান নারায়ণগঞ্জে দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামে একই সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। কঠিন সময়ে সংগঠন টিকিয়ে রাখা, নেতাকর্মীদের পাশে থাকা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের পারস্পরিক সমন্বয় ছিল দৃশ্যমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আজহারুল ইসলাম মান্নানের পক্ষে প্রচারণাতেও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদের উপস্থিতি দেখা গেছে। নির্বাচনী বিভিন্ন কর্মসূচিতে দুই নেতাকে একই মঞ্চেও দেখা যায়।
কিন্তু নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে যায় বলে অভিযোগ তৃণমূলের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা বলেন, নির্বাচন ও মনোনয়নকে ঘিরে তৈরি হওয়া দূরত্ব পরবর্তীতে রাজনৈতিক বলয় ও প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
তাদের অভিযোগ, আগে যে সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক রাজনৈতিক সহযোগিতার, এখন তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুসারীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নিয়েছে।
বালুর ঘাটে সংঘর্ষ, মুখোমুখি দুই বলয়
এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে প্রকাশ্য ঘটনাগুলোর একটি ঘটে চলতি বছরের ১২ মার্চ সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় কাঁচপুর সেতু-সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে বালু ও পাথরের লোড-আনলোড ঘাটকে কেন্দ্র করে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ও দখলকে কেন্দ্র করে অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ও সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এক প্রতিবেদনে অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার কথা বলা হলেও অন্য প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা অন্তত ১৫ জন উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় মামুন মাহমুদের ছোট ভাই রাসেল মাহমুদের আহত হওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঘটনায় রাসেল মাহমুদ ঘাটে গেলে মান্নান বলয়ের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রিপন সরকারসহ অন্যরা সেখানে উপস্থিত হন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। তবে রিপন সরকার ওই সময় অভিযোগ করেন, বৈধ ইজারা ছাড়া সরকারি জায়গা দখলের চেষ্টা করা হচ্ছিল। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছিল, বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ থেকে প্রাপ্ত ইজারার দখল বুঝে নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। অর্থাৎ ঘটনার পেছনে ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ও ইজারাসংক্রান্ত বিরোধের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির দুই বলয়ের প্রকাশ্য সংঘাতের বিষয়টি আর গোপন থাকেনি।
জেলা বিএনপির কার্যালয় নিয়ে নতুন বিতর্ক
দুই বলয়ের দূরত্বের আরেকটি বড় প্রকাশ্য ঘটনা ঘটে ১৮ জুন। সেদিন সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড সরিয়ে সেখানে সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টানানো হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, মান্নানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেনসহ কয়েকজন ওই কার্যালয়ে গিয়ে জেলা বিএনপির সাইনবোর্ড সরিয়ে নতুন সাইনবোর্ড লাগান। কার্যালয় থেকে অন্য কয়েকজন সংসদ সদস্যের ছবিও সরিয়ে ফেলার ঘটনা নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়।
ঘটনার দুই দিন পর ২০ জুন আবারও আগের জেলা বিএনপির সাইনবোর্ড ও ছবি পুনঃস্থাপন করা হয়। প্রথম আলোর তথ্যমতে, এর আগে জেলা বিএনপির কার্যালয়টি প্রায় ছয় মাস আগে দলীয় নেতাদের উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হয়েছিল।
দলীয় কার্যালয়ের সাইনবোর্ড পরিবর্তন ও পুনঃস্থাপনের এই ঘটনা সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। তৃণমূলের নেতাদের অভিযোগ, একটি জেলা পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়কে কেন্দ্র করে দুই বলয়ের এমন টানাপোড়েন দলীয় ঐক্যের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।
সোনারগাঁ থেকে সিদ্ধিরগঞ্জে প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি?
আজহারুল ইসলাম মান্নান দীর্ঘদিন ধরে সোনারগাঁয়ের রাজনীতির পরিচিত মুখ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এই আসনের অন্তর্ভুক্ত সোনারগাঁয়ের পাশাপাশি সিদ্ধিরগঞ্জও তার সংসদীয় এলাকার অংশ।
নির্বাচনের আগেও সিদ্ধিরগঞ্জে মান্নানের ধারাবাহিক গণসংযোগ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম ছিল। বিভিন্ন সভায় তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের উন্নয়ন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত এলাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য হিসেবে সিদ্ধিরগঞ্জে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও অনুসারীদের তৎপরতা বাড়ার বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
তৃণমূলের অভিযোগ, সিদ্ধিরগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে অধ্যাপক মামুন মাহমুদের যে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বলয় ছিল, সেখানে এখন মান্নান বলয়ের প্রভাব বাড়ছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে নতুন বলয় গড়ে উঠছে।
পুরোনো অনুসারীদের বলয় বদল
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, মামুন মাহমুদের সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা কয়েকজন নেতা এখন সংসদ সদস্য মান্নানের ঘনিষ্ঠ বলয়ে সক্রিয় হচ্ছেন।
জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড পরিবর্তনের ঘটনায় যাদের নাম সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাদের মধ্যে ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন অন্যতম। বালুর ঘাটের সংঘর্ষের সময়ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রিপন সরকারের নাম আসে।
তবে নেতাকর্মীদের বলয় পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, সাংগঠনিক অবস্থান, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ—কোনটি কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আদমজী ইপিজেড এলাকার এক ঠিকাদার দাবি করেন, রাজনৈতিক বলয় পরিবর্তনের পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধার হিসাবও থাকতে পারে। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন একটি বলয়ের সঙ্গে রাজনীতি করেও অনেকে নিজেদের প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। ফলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা শক্তিশালী বলয়ের দিকে ঝুঁকছেন।
তবে এই বক্তব্যের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তৃণমূলে বিভক্তির আশঙ্কা
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন, শীর্ষ পর্যায়ের দুই বলয়ের দূরত্ব যত বাড়বে, ততই তার প্রভাব পড়বে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ের রাজনীতিতে।
একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সবাই একটি বৃহত্তর সাংগঠনিক বলয়ের মধ্যে ছিলেন। এখন বিভিন্ন এলাকায় ‘কার লোক’—এই পরিচয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে অনেক নেতাকর্মীকে পক্ষ বেছে নিতে হচ্ছে।
আরেক নেতা বলেন, দুই শীর্ষ নেতার বিরোধ যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে অনুসারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে দলীয় কর্মসূচি, কমিটি গঠন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় দলের স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি সংঘর্ষ, দখলবিরোধ বা দলীয় কার্যালয় নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধে গড়ায়, তখন তা সংগঠনের ভাবমূর্তির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্যও প্রশ্ন তৈরি করে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে একসঙ্গে রাজনীতি করা মামুন মাহমুদ ও আজহারুল ইসলাম মান্নানের বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে দলীয় পর্যায়ে চলছে নানা আলোচনা। একসময় যাদের রাজনৈতিক সমন্বয় নারায়ণগঞ্জ বিএনপির শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন তাদের অনুসারীদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধের ঘটনাগুলো দলটির তৃণমূলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বালুর ঘাটের সংঘর্ষ এবং জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড নিয়ে বিতর্ক—এই দুটি ঘটনাই দেখিয়েছে, দ্বন্দ্বটি শুধু গুঞ্জন বা পর্দার আড়ালের মতবিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতেও পড়ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দলের স্বার্থে এই দূরত্ব কমিয়ে দুই নেতা আবারও রাজনৈতিক সমন্বয়ের পথে ফিরবেন, নাকি সিদ্ধিরগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দুই বলয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়বে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই নেতার বক্তব্য নেওয়া জরুরি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ হবে।








Discussion about this post