পাসপোর্ট অফিসে ‘দালালমুক্ত সেবা’র প্রচার, আড়ালে কোডে ফাইল পাসের অভিযোগ
মহানগর প্রতিনিধি :
বাইরে মাইকে চলছে ‘দালালমুক্ত সেবা’র প্রচার। অথচ অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের ভেতরেই বিশেষ সংকেত, কোড নম্বর ও নির্দিষ্ট ই-মেইল ঠিকানার মাধ্যমে ফাইল চিহ্নিত করে দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আর সাধারণ আবেদনকারীদের পড়তে হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার ফাইল ফেরত ও হয়রানির মুখে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত দালালদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট।
এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত আবেদন প্রক্রিয়াকরণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পরিমাণ অনুযায়ী, প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতে পারে বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সেবা কার্যক্রম ঘিরে এমন নানা অভিযোগ ও অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে।
সাধারণ আবেদনকারীর দীর্ঘ অপেক্ষা, দালালের ফাইল দ্রুত
সরেজমিনে দেখা যায়, সঠিক কাগজপত্র নিয়ে পাসপোর্টের জন্য আসা সাধারণ আবেদনকারীদের অনেককেই দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কখনো কাগজপত্রের ঘাটতি, কখনো যাচাইসংক্রান্ত জটিলতার কথা বলে ফাইল ফেরত দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে, দালালদের মাধ্যমে আসা কিছু ফাইল তুলনামূলক দ্রুততার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ আবেদনকারীদের। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব ফাইল শনাক্ত করতে হাতে লেখা কিছু নম্বর, সংকেত ও নির্দিষ্ট ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করা হয়।
অনুসন্ধানে কয়েকটি আবেদনের পাতায় ‘২০২০’, ‘Mos’, ‘R-119’ এবং ‘২৫২৬-০০০১৯৮০-জ’-এর মতো হাতে লেখা নম্বর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কয়েকটি নির্দিষ্ট জিমেইল ঠিকানা ব্যবহার করে ফাইল আলাদা করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব সংকেত বা ই-মেইল ঠিকানার সঙ্গে পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণে কোনো বৈধ প্রশাসনিক পদ্ধতির সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
প্রতিদিন শত শত আবেদন, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চারশ থেকে ৮০০টি আবেদন জমা পড়ে। তাদের দাবি, এর একটি বড় অংশই বিভিন্ন দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত ফি ও আনুষঙ্গিক খরচের বাইরে প্রতি ফাইলে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ আরও বেশি বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
এই হিসাবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তবে প্রতিদিন পাঁচ লাখ টাকা লেনদেনের যে দাবি করা হচ্ছে, তার স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য হিসাব বা নথি পাওয়া যায়নি।
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগে পাসপোর্ট কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম, উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন, উচ্চমান সহকারী কামরুল হাসান, অফিস সহকারী মো. আল মামুন ও মো. সাখাওয়াত হোসেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর কেউ কেউ দালালদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে ও সরাসরি যোগাযোগ রেখে ফাইল প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন। এমনকি অফিসের নির্ধারিত সময়ের পরও বিশেষ কিছু ফাইল নিয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেনের তথ্য বা অফিসিয়াল নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর হাতে সংবেদনশীল কাজ?
অনুসন্ধানের সময় অফিসের ৩০৫ নম্বর কক্ষে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবুরুল ইসলাম বাবরকে কম্পিউটারে বসে দাপ্তরিক কাজে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। একইভাবে তৃতীয় তলায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদেরও কম্পিউটার ব্যবহার করে দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বা পাসপোর্ট-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া অন্যদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে কি না।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাবুরুল ইসলাম বাবর বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তিনি কম্পিউটারে বসে ফাইল যাচাইয়ের কাজে সহযোগিতা করছেন।
যদি সত্যিই সংবেদনশীল সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনায় অনুমোদনহীন বা অননুমোদিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা থাকে, তাহলে তা তথ্যনিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ
সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা আকলিমা বেগমের অভিযোগ, তিনি দুই দফা পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েও কাগজপত্রের ঘাটতির কথা শুনে ফিরে আসেন। পরে বাইরের একটি কম্পিউটারের দোকানের মাধ্যমে আবেদন করাতে অতিরিক্ত প্রায় তিন হাজার টাকা দেওয়ার পর একই কাগজপত্রে দ্রুত কাজ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
মাসদাইরের গার্মেন্টসকর্মী সাগর মিয়ার অভিযোগ, সকাল সাতটায় পাসপোর্ট অফিসে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি ফাইল জমা দিতে পারেননি। তার ভাষ্য, সাধারণ আবেদনকারীদের দীর্ঘ অপেক্ষার বিপরীতে নির্দিষ্ট সংকেতযুক্ত ফাইলগুলো দ্রুত ভেতরে চলে যেতে দেখা যায়।
এদিকে অফিসের আশপাশে নুরু, হাদী, রাজিব ও শাহজালালসহ কয়েকজন বহিরাগত ব্যক্তি প্রকাশ্যে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কাজের জন্য লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কার্যালয়কে দালালমুক্ত রাখতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
তবে লোকবল সংকটের কারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে সাময়িকভাবে কিছু কাজে সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। সংকেত, কোড কিংবা অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ফাইল দ্রুত অনুমোদনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, পাসপোর্ট কার্যালয়ের অনিয়ম ও দালালির বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে দাপ্তরিক কাজ করানো অত্যন্ত দুঃখজনক। কোড ব্যবহারের মাধ্যমে ফাইল দ্রুত অনুমোদন এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন উঠছে নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে
সরকারি সেবাকে সহজ, স্বচ্ছ ও দালালমুক্ত করার ঘোষণা থাকলেও নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সেই ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষ করে সাধারণ আবেদনকারীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, দালালদের মাধ্যমে দ্রুত কাজ হওয়ার অভিযোগ, ফাইলে রহস্যজনক সংকেতের ব্যবহার এবং সংবেদনশীল কম্পিউটারভিত্তিক কাজে দায়িত্বের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ—সবকিছুই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ফাইল, সিসিটিভি ফুটেজ, কম্পিউটার লগ, আবেদন ও অনুমোদনের সময়ের তথ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ববণ্টন এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দালালমুক্ত সেবার প্রচারের পাশাপাশি বাস্তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সরকারি সেবাকে প্রভাবিত করছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ ও সরকারি সেবায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে অভিযোগগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত এখন সময়ের দাবি।









Discussion about this post