দলিলের সইয়ে ঘুষের ছায়া: চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ—সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ—দলিল নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকে ঘিরে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কোথাও দুদকের অভিযানে নগদ টাকা উদ্ধার ও কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রেপ্তার হচ্ছেন, কোথাও ভিডিওতে ঘুষ লেনদেনের দৃশ্য প্রকাশ্যে আসছে, আবার কোথাও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যেসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে, সেগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি আরও বড় ধরনের অনিয়মের আভাস?
সর্বশেষ চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ের ঘটনায় সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ সাবরেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান, হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপণ দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুদকের অভিযোগ ছিল, ত্রুটিহীন দুটি অংশীদারি চুক্তিপত্র নিবন্ধনের জন্য অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। অভিযোগকারী একজন আইনজীবী দুদকের হটলাইন ১০৬-এ অভিযোগ করার পর অভিযান চালানো হয়।
পরদিন আদালতে ফারুক ইসলাম ও রূপণ দাশ জবানবন্দি দেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাবরেজিস্ট্রারের নির্দেশেই তাঁরা ঘুষের টাকা নিয়েছিলেন। তাঁদের জবানবন্দিতে বলা হয়, দলিলটির সরকারি ফি ছিল ১৫ হাজার টাকা; এর বাইরে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব বক্তব্য আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আগে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। দুদক জানিয়েছে, ঘুষ লেনদেনের পুরো চক্র শনাক্তে তদন্ত চলছে।
শুধু চট্টগ্রাম নয়, অভিযোগের বিস্তার অন্যত্রও
সাবরেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে ঘুষ, দালালের দৌরাত্ম্য ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গণশুনানি ও অনুসন্ধানের ঘটনাও সামনে এসেছে। সম্প্রতি একটি গণশুনানিতে সেবাগ্রহীতারা বিভিন্ন সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ লেনদেন ও দালালনির্ভরতার অভিযোগ তোলেন। সেখানে দুদকের পক্ষ থেকে ঘুষের টাকা লেনদেনকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ কৌশলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
চকরিয়া সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ের সাম্প্রতিক এক অভিযানে আরও বড় অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে দুদক। সেখানে সাবরেজিস্ট্রারের লকার ও কর্মচারীদের ড্রয়ার থেকে মোট ৬ লাখ ৪২ হাজার ১০০ টাকা এবং ঘুষ লেনদেনের হাতের লেখা ৪১টি স্লিপ উদ্ধারের কথা জানানো হয়। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অর্থ জমি রেজিস্ট্রির সময় অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
এ ছাড়া ত্রিশাল সাবরেজিস্ট্রি অফিসেও অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুদক অভিযান চালিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জেও পুরোনো নয় অভিযোগের ইতিহাস
সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের নামও নতুন নয়। ২০১৮ সালে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বন্দর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার এছহাক আলী মণ্ডলের ঘুষ নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। নিবন্ধন অধিদপ্তরের তৎকালীন সিদ্ধান্তে ভিডিওটিকে ঘুষ গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, আড়াইহাজার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিলে স্বাক্ষরের আগে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ছিল এবং এ-সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জও এমন অভিযোগের বাইরে নয়। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে রূপগঞ্জ (পূর্ব) সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া দলিলে স্বাক্ষর না করা এবং অফিসে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ—চূড়ান্তভাবে সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত প্রয়োজন।
আরও গুরুতর বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সাবেক এক সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত প্রায় সোয়া কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক মামলা করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের মামলা ঘুষ গ্রহণের সরাসরি প্রমাণ নয়; তবে সাবরেজিস্ট্রি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদ ও আয়ের উৎস যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আনে।
ঘুষের অভিযোগের ধরনও একই রকম
বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে আসে—সরকারি ফি নির্ধারিত থাকার পরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি, দলিলে ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও নিবন্ধন আটকে রাখা, দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার নামে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ।
সম্প্রতি দুদকের একটি গণশুনানিতে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দালালের দৌরাত্ম্য, ঘুষ এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও উঠে এসেছে।
এমন অভিযোগের কারণে একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য সরকারি ফি আর অনানুষ্ঠানিক ‘অতিরিক্ত খরচ’—এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে জমি কেনাবেচা, বণ্টন, অংশীদারি চুক্তি বা অন্যান্য দলিল নিবন্ধনের সময় সেবাগ্রহীতারা সময়মতো কাজ শেষ করার তাগিদে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ না করে অর্থ দেওয়ার পথ বেছে নেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন গণশুনানি ও সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে।
‘ধরা পড়লে’ প্রকাশ্যে আসে, না ধরা পড়লে?
চট্টগ্রামের ঘটনায় যেমন একজন আইনজীবী দুদকের হটলাইন ১০৬-এ অভিযোগ করায় অভিযান সম্ভব হয়েছে, তেমনি অন্যান্য জায়গায় ভিডিও, লিখিত অভিযোগ, গণশুনানি কিংবা দুদকের অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগ সামনে এসেছে। অর্থাৎ একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়—যে লেনদেনগুলো অভিযোগ বা অভিযানের আওতায় আসে না, সেগুলোর কতটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নজরদারির মধ্যে থাকে?
এখানেই ডিজিটাল ও স্বচ্ছ নিবন্ধন ব্যবস্থার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। সরকারি ফি কত, কোন দলিলের জন্য কত টাকা দিতে হবে, কত সময়ে সেবা পাওয়ার কথা—এসব তথ্য দৃশ্যমান ও সহজলভ্য হলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার সুযোগ কমতে পারে। একই সঙ্গে নগদ লেনদেন কমানো, সেবাগ্রহীতার অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, অফিসের কার্যক্রমের নজরদারি এবং নিয়মিত সম্পদ যাচাই কার্যকর করা জরুরি।
দুদকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ঘুষ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তাদের অনুসন্ধান ও তদন্তের আওতায় পড়ে।
নারায়ণগঞ্জে নজরদারি জরুরি
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক জেলা। জমি, শিল্পকারখানা, আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল লেনদেনের কারণে এখানে দলিল নিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা। ফলে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাবও বিস্তৃত হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জে অতীতে প্রকাশ্য ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে সাবরেজিস্ট্রার বরখাস্ত হওয়ার ঘটনা যেমন রয়েছে, তেমনি রূপগঞ্জের সাবরেজিস্ট্রারকে ঘিরে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ এবং সাবেক সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা হয়েছে। ফলে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, নারায়ণগঞ্জের সব সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিয়মিত নজরদারি, সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ যাচাই এবং দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার তাই শুধু একটি অফিসের ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় প্রেক্ষাপটটি আড়ালে থেকে যায়। আবার প্রমাণ ছাড়া দেশের সব সাবরেজিস্ট্রি অফিসকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলাও যথাযথ নয়। বরং প্রকাশ্যে আসা অভিযান, মামলা, জবানবন্দি ও অভিযোগগুলোকে ভিত্তি করে প্রশ্নটি হওয়া উচিত—যেখানে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, সেখানে কার্যকর নজরদারি কতটা আছে এবং সাধারণ নাগরিক সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়েই হয়রানিমুক্তভাবে দলিল নিবন্ধনের সেবা পাচ্ছেন কি না ?








Discussion about this post