সোনারগাঁয়ে অবৈধ গ্যাসে চুনা-ঢালাই কারখানা
অভিযান হয়, কারখানা ভাঙে—কয়েকদিন পরই আবার জ্বলে চুলা
সোনারগাঁ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগে পরিচালিত চুনা ও ঢালাই কারখানার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চলছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের অভিযানে কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে অবৈধ সংযোগ, জব্দ করা হচ্ছে পাইপ-রাইজার-বার্নার।
কিন্তু অভিযানের পর কিছুদিন যেতে না যেতেই অনেক জায়গায় আবারও গড়ে উঠছে চুল্লি, বসছে পাইপলাইন, জ্বলছে গ্যাসের চুলা।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে এত অভিযান হলেও এর স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন?
এমন পরিস্থিতিতে সোনারগাঁয়ে প্রায় ৫৬টি অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা বন্ধ এবং এসব কারখানার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মাঠে নেমেছে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন।
আজ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় উপজেলার উদ্ববগঞ্জ এলাকায় সোনারগাঁও প্রেস ক্লাবের সামনে সংগঠনটির উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করে এসব কারখানা পরিচালিত হলেও কার্যকরভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের নাম-পরিচয় প্রকাশের পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
অভিযানের পরও কেন বন্ধ হচ্ছে না?
সোনারগাঁয়ে অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানার বিরুদ্ধে তিতাসের অভিযান নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকেও অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহারকারী চুনা ও ঢালাই কারখানা উচ্ছেদ করা হয়। ওই সময় তিতাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কয়েকটি কারখানা প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার করছিল।
২০২৬ সালেও ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানো হয়েছে। জুনে তিনটি কারখানা উচ্ছেদ করা হয়। জুলাইয়ে চারটি চুনা ও একটি ঢালাই কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্নের খবর প্রকাশিত হয়। একই মাসে আরও তিনটি চুনা কারখানা উচ্ছেদ করা হয়। আগস্টেও সোনাখালী, প্রতাপেরচর ও পিরোজপুর এলাকায় তিনটি চুনা কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সেপ্টেম্বরেও পাঁচটি চুনা কারখানার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ, অভিযান হচ্ছে—কিন্তু অবৈধ কারখানার বিস্তার পুরোপুরি থামছে না। এই বাস্তবতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
‘ভাঙা-গড়ার খেলা’ নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল
গত ২৬ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সোনারগাঁয়ের অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানাকে কেন্দ্র করে ‘ভাঙা-গড়ার খেলা’র চিত্র উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, তিতাস একাধিকবার কারখানা ভেঙে দেওয়ার পরও অল্প সময়ের মধ্যে নতুন করে চুল্লি তৈরি করে কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুল্লি পুনর্নির্মাণে তুলনামূলক কম খরচ হওয়ায় অভিযানকে পাশ কাটিয়ে আবার কারখানা চালু করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এখানেই মূল প্রশ্ন—শুধু কারখানা ভেঙে দিলেই কি গ্যাস চুরি বন্ধ করা সম্ভব?
যদি কোনো স্থানে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর আবার একই জায়গায় নতুন সংযোগ বসে, তাহলে শুধু কারখানা মালিক নয়; সংযোগ স্থাপন, পাইপলাইন বসানো, নজরদারি এবং পুনঃসংযোগের পুরো প্রক্রিয়াটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
গ্যাস চুরি নাকি পরিবেশবিধ্বংসী ব্যবসার নিরাপদ আশ্রয় ?
অবৈধ গ্যাসে পরিচালিত এসব কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু সরকারি গ্যাস চুরিতে সীমাবদ্ধ নয়। চুনা তৈরিতে পাথর পোড়ানোর ফলে ধোঁয়া, ছাই ও চুনের গুঁড়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বলে পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্যও রয়েছে—আবাসিক এলাকায় পাথর পুড়িয়ে চুন তৈরি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং এসব কারখানাকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয় না। ধোঁয়া ও ধুলার কারণে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ একই সঙ্গে এখানে রয়েছে সরকারি গ্যাসের অবৈধ ব্যবহার, রাজস্ব ক্ষতি, পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি।
৫৬ কারখানার তালিকা হলে ব্যবস্থা কোথায়?
পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের দাবি অনুযায়ী, সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫৬টি চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে উঠেছে। মানববন্ধনে বক্তারা এসব কারখানার সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় ও ভূমিকা তদন্ত করে প্রকাশ এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রশাসন ও তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মদদ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এভাবে অবৈধ কারখানা পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
অভিযানকারীদের জন্যও বড় পরীক্ষা
তিতাসের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এমনকি জমির মালিকদের বিরুদ্ধেও মামলা করার কথা জানানো হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—একদিকে কারখানা ভাঙা হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযানের পরবর্তী নজরদারি কোথায়?
একটি কারখানা উচ্ছেদের পর সেই জমিতে পুনরায় চুল্লি নির্মাণ হয়েছে কি না, বিচ্ছিন্ন করা গ্যাসলাইন আবার সংযুক্ত হয়েছে কি না, অবৈধ পাইপলাইন কে সরবরাহ করছে এবং এসব কারখানার অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী কারা—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক নজরদারি ছাড়া শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মানববন্ধনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
শুক্রবারের মানববন্ধনে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি কবি রহমান মুজিব সভাপতিত্ব করেন। সাধারণ সম্পাদক মোকাররম মামুনের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ের পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে এসব কারখানার পেছনে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তারা তিতাস গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সূবর্ণগ্রাম সংস্কৃতি অঙ্গনের সভাপতি কবি শাহেদ কায়েস, সোনারগাঁও প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক রবিউল হুসাইন, সুজন সোনারগাঁও শাখার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, উদীচী সোনারগাঁও শাখার সভাপতি শংকর প্রকাশ, পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সহসভাপতি মোয়াজ্জেনুল হক, যুগ্ম সম্পাদক মোফাখখার সাগর, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য রোকেয়া আক্তার ও শিপন চৌধুরীসহ অনেকে।
এ ছাড়া রাশেদ এহসান, রমিম, সাংবাদিক খায়রুল ইসলাম খোকন, ইমরান হোসেন, ডালিম হোসাইন, বিরুধ আলীসহ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এখন প্রশ্ন একটাই—চুলা ভাঙবে, নাকি চক্র ভাঙবে ?
সোনারগাঁয়ে ধারাবাহিক অভিযানের পরও যদি একই এলাকায় নতুন করে অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে ওঠে, তাহলে শুধু স্থাপনা ভেঙে দেওয়াকে সমাধান বলা কঠিন। প্রয়োজন অবৈধ গ্যাস সংযোগের উৎস শনাক্ত করা, সংযোগ স্থাপনকারী ও সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা, পুনঃসংযোগ ঠেকাতে স্থায়ী নজরদারি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা যাচাই করা।
কারণ কারখানা ভাঙা যায় একদিনে; কিন্তু অবৈধ গ্যাসের নেটওয়ার্ক ও তার পেছনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষত থাকলে ভাঙা চুল্লি আবারও জ্বলে উঠতে পারে।
পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের মানববন্ধন সেই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে—সোনারগাঁয়ে অবৈধ গ্যাসে জ্বলা চুলা বন্ধ হবে, নাকি শুধু অভিযানের তালিকায় আরও কিছু কারখানার নাম যোগ হবে ?









Discussion about this post